Logo
×

Follow Us

সারাদেশ

বিজ্ঞানীদের দলাদলিতে ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণা স্থবির

৫৫ বছরের ইতিহাসে এবারই প্রথম বিজ্ঞানীর পরিবর্তে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা ডিজি

Icon

গাজীপুর প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৫ মে ২০২৬, ২৩:৪৮

বিজ্ঞানীদের দলাদলিতে ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণা স্থবির

ড. আমিনুল ইসলাম ডিজি নিয়োগ দেওয়ায় গাজীপুরে ব্রি ক্যাম্পাসে বিজ্ঞানীদের একটি অংশ স্বাগত জানালেও আরেক পক্ষ মূল ফটক, বিভিন্ন দপ্তর ও গবেষণাগারে তালা ঝুলিয়ে দেয়

টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলে দেশের বিভিন্ন হাওর অঞ্চলে বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতির মধ্যেই দেশের শীর্ষ কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটে (ব্রি) দেখা দিয়েছে নজিরবিহীন অস্থিরতা। নেতৃত্ব সংকট, দলাদলি ও প্রশাসনিক অচলাবস্থায় কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম। এতে ধান গবেষণা ও খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

গত রোববার ব্রির মহাপরিচালক (ডিজি) পদে ড. আমিনুল ইসলামকে রুটিন দায়িত্ব দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার। দীর্ঘ এক মাস ডিজিশূন্য থাকার পর এই নিয়োগ দেওয়া হলেও তা ঘিরেই শুরু হয় তীব্র বিক্ষোভ। ড. আমিনুল ইসলামের নিয়োগে গাজীপুরে ব্রি ক্যাম্পাসে বিজ্ঞানীদের একটি অংশ স্বাগত জানালেও আরেক পক্ষ মূল ফটক, বিভিন্ন দপ্তর ও গবেষণাগারে তালা ঝুলিয়ে দেয়। দুদিন ধরে উত্তপ্ত পরিস্থিতি বিরাজ করে পুরো ক্যাম্পাসে।

এমন পরিস্থিতে নতুন ডিজি ড. আমিনুল ইসলাম সোমবার পুলিশি নিরাপত্তায় প্রথম দিন অফিস করলেও মাত্র এক দিনের মাথায় তাঁর নিয়োগ বাতিল করে কৃষি মন্ত্রণালয়। মঙ্গলবার জারি করা নতুন প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (গবেষণা) আফসারী খানকে নিজ দায়িত্বের পাশাপাশি ব্রির মহাপরিচালকের শূন্যপদের বিপরীতে আয়ন-ব্যয়ন কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করবেন। তবে এই সিদ্ধান্তেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। এখনো মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে দুই পক্ষ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্রির ৫৫ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম এমন ঘটনা ঘটল, যেখানে বিজ্ঞানীদের পরিবর্তে প্রশাসনিক ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা কার্যত প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্বে নিয়েছেন। এতে গবেষণার ধারাবাহিকতা ও কার্যকারিতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ব্রির একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির অধীনে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার বিভিন্ন প্রকল্প চলমান। অভিযোগ রয়েছে, গত ৫ আগস্টের পর একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী ঠিকাদারদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়সহ নানা অনিয়মে জড়িত। নতুন ডিজি নিরপেক্ষ হওয়ায় এই গোষ্ঠীর স্বার্থে আঘাত লাগার আশঙ্কা থেকেই তাঁকে ঘিরে বিরোধ তৈরি হয়।

একজন জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মহাপরিচালক পদে নিয়োগ পেতে অন্তত ১০ জন কর্মকর্তা সক্রিয়ভাবে তদবির করেন। জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে নিয়োগ হওয়ায় অসন্তুষ্ট একটি পক্ষ আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ে। এদিকে ব্রি বিজ্ঞানী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ড. হাবিবুর রহমান মুকুলের আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন। যদিও তিনি মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছেন।

এর আগে গত ২ এপ্রিল মহাপরিচালক ড. মোহাম্মদ খালেকুজ্জামানের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর পদটি শূন্য হয়ে পড়ে। পরে পরিচালক (প্রশাসন) ড. মুন্নুজান খানমও অবসরে গেলে শীর্ষ দুই পদ একসঙ্গে শূন্য হয়ে প্রতিষ্ঠান কার্যত নেতৃত্বহীন হয়ে পড়ে। এই শূন্যতার প্রভাব সরাসরি পড়ে প্রশাসন ও গবেষণায়। উচ্চপর্যায়ের অনুমোদন ছাড়া কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব না হওয়ায় প্রকল্প বাস্তবায়ন, গবেষণা পরিকল্পনা ও ক্রয় কার্যক্রম থমকে যায়। বহু ফাইল নিষ্পত্তিহীন অবস্থায় পড়ে থাকে। গবেষণা কার্যক্রমেও তৈরি হয় বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা। মাঠপর্যায়ে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য যানবাহন ব্যবহার বন্ধ থাকায় বিজ্ঞানীরা পরীক্ষামূলক প্লট পরিদর্শনে যেতে পারেননি। একই সঙ্গে ল্যাবরেটরি উপকরণ সংগ্রহ, মাটি পরীক্ষা ও অন্যান্য গবেষণা ব্যয়ও বন্ধ হয়ে যায়। আর্থিক ব্যবস্থাপনাও জটিল হয়ে পড়ে। মহাপরিচালকের অনুমোদন ছাড়া প্রকল্পের অর্থ ছাড় সম্ভব না হওয়ায় কিস্তির টাকা আটকে যায়। এতে প্রকল্প বাস্তবায়ন বিলম্বিত হয় এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

এই পরিস্থিতির প্রভাব পড়ছে সরাসরি কৃষিক্ষেত্রে। চলমান বোরো মৌসুমে কৃষকদের প্রযুক্তিগত সহায়তা পৌঁছাতে সমস্যা হচ্ছে। কৃষিযন্ত্র সরবরাহেও বিঘ্ন দেখা দিয়েছে। ফলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। পাশাপাশি আসন্ন আউশ মৌসুমের প্রস্তুতিও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

অভিযোগ রয়েছে, ব্রির সাম্প্রতিক ৭৫টি পদে নিয়োগ নিয়েও অনিয়ম হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে পরীক্ষা ছাড়াই নিয়োগ এবং ভুয়া সনদের অভিযোগ উঠেছে। এমনকি ঘুষ লেনদেনের ঘটনায় একজনকে গ্রেপ্তারের তথ্যও পাওয়া গেছে।

কৃষি সচিব রফিকুল ই মোহাম্মদ বলেন, ব্রিতে সৃষ্ট অস্থিরতা দ্রুত নিরসনে কাজ করছে মন্ত্রণালয়।শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

Logo