উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ হাওরজুড়ে কৃষকের এখন ‘তীরে এসে তরি ডোবা’র দশা। একদিকে বন্যার ঝুঁকি, অন্যদিকে পাকা–আধপাকা ধান। কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি, বজ্রপাত আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কৃষকের ঘরে ঘরে আতঙ্ক নেমে এসেছে। বন্যার আশঙ্কায় কৃষকেরা হাওরে যে যেভাবে পারছেন ধান কাটছেন। সপ্তাহখানেক সময় পেলে মোটামুটি সামলে নেওয়া যেত। কিন্তু এই সময়ের নিশ্চয়তা দিতে পারছে না কেউ। গতকাল সোমবার পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ‘ভারি থেকে অতিভারি’ বৃষ্টিপাতের প্রভাবে সিলেট, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার জেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যা হতে পারে বলে আভাস দিয়েছে। এ অবস্থায় কোথাও পাকা, আবার কোথাও ‘শেষ সম্বল’ হারানোর ভয়ে আধপাকা ধানই কাটছেন কৃষক। কিন্তু গত দুদিন বৃষ্টি, তুফান ও বজ্রপাতের কারণে মাঠে নামতে পারছেন অনেক কৃষক।
আবহাওয়া অধিদপ্তর ও বৈশ্বিক আবহাওয়া সংস্থাগুলোর তথ্যের বরাতে গতকাল সোমবার পাউবোর বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর অববাহিকায় আগামী তিনদিন ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টিপাত হতে পারে। ফলে সিলেট, সুনামগঞ্জের সুরমা-কুশিয়ারা ও মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ জেলার মনু-খোয়াই নদীর পানি বাড়তে পারে। আগামীকাল বুধবার সুরমা, কুশিয়ারা, খোয়াই, জুড়ি নদী এবং এর প্রধান উপনদীগুলোর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে ‘প্রাক-মৌসুমি বিপৎসীমার’ উপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে। ফলে সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার নদী সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে সৃষ্টি হতে পারে বন্যা পরিস্থিতির। এমন পরিস্থতিতে জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি গতকাল সোমবার জরুরি সভা করেছে।
কৃষকেরা জানান, গত কয়েক দিনের বৃষ্টিতে অনেক হাওরে পানি থাকায় কম্বাইন্ড হারভেস্টার মেশিন চলছে না, আবার হাতে ধান কাটার শ্রমিকও মিলছে না। রোদ না থাকায় কাটা ধান মাড়াই ও শুকানো যাচ্ছে না। এরমধ্যে একের পর এক বজ্রপাতে মৃত্যুর কারণে হাওরজুড়ে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, এবার সাতটি হাওর জেলায় ৯.৬৩ লাখ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে হাওর এলাকায় ৪.৫৫ লাখ হেক্টর জমি। হাওরের ফসলের ওপর নির্ভর করছে জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তার একটি বড় অংশ। কৃষি বিভাগের হিসাবে, এ পর্যন্ত হাওরাঞ্চলে প্রায় ৪৮ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। তার আগেই যদি বন্যা আঘাত হানে, তাহলে বিপুল ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
সুনামগঞ্জে ৬০২টি কম্বাইন্ড হারভেস্টার থাকলেও এর বড় অংশই এখন অচল। একটি হারভেস্টার চালাতে প্রতিদিন ১০০-১২০ লিটার ডিজেল লাগে। কিন্তু সেই পরিমাণ জ্বালানি নিয়মিত পাওয়া যাচ্ছে না।
সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, এখন যে আবহাওয়া পরিস্থিতি, তাতে কৃষকদের মাঠে ধান কাটাই মুশকিল হয়ে যাচ্ছে। বজ্রপাতের ভয়ে কৃষক জমিতে নামতে পারছেন না। গতকাল মঙ্গলবারও সুনামগঞ্জে হাওরে ধান কাটার সময় বজ্রপাতে তিন কৃষকের প্রাণ গেছে। তবুও আমরা প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দিচ্ছি।
সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান বলেন, আমরা ব্যাপকভাবে প্রচারণা চালাচ্ছি, যাতে দ্রুত হাওরের ধান কাটা শেষ করা যায়। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কিশোরগঞ্জে দুদিনের বৃষ্টিতে দুই হাজার হেক্টর জমির পাকা ধান তলিয়ে গেছে। নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজারের হাওরগুলোতেও একই চিত্র। কোথাও জমিতে পানি জমে থাকায় মেশিন নামানো যাচ্ছে না, কোথাও শ্রমিকের অভাব, কোথাও আবার শিলাবৃষ্টি ও বজ্রপাত নতুন করে ভয় তৈরি করেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, হাওরের ভেতরে অপরিকল্পিত সড়ক নির্মাণ, নদী-খাল ভরাট, পলি জমে নাব্যতা কমে যাওয়া এবং ফসল রক্ষা বাঁধের ত্রুটির কারণে পানি দ্রুত নামতে পারছে না। ফলে অল্প বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, এবার সুনামগঞ্জে ১৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭১০টি প্রকল্পের মাধ্যমে ৬০২ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার করা হয়েছে। কিন্তু টানা বৃষ্টিতে অনেক বাঁধ দুর্বল হয়ে পড়েছে।
২০১৭ সালের অকালবন্যার ভয়াবহতা এখনো ভুলতে পারেননি হাওরের মানুষ। তখন বাঁধ ভেঙে পুরো ফসল তলিয়ে গিয়েছিল, প্রায় দুই লাখ কৃষক পরিবারকে খাদ্যসহায়তা দিতে হয়েছিল সরকারকে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এবার আরও বেশি শঙ্কিত সবাই। পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাসমির রেজা বলেন, সুনামগঞ্জের সব উপজেলায় এখনো ইউএনও নেই। অনেক কৃষি কর্মকর্তারা পরীক্ষার ডিউটিতে ব্যস্ত। ফলে আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী হাওরে দুর্যোগ প্রস্তুতিতে সমন্বয়হীনতা দেখা দিয়েছে।
সুনামগঞ্জ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন হাওলাদার আবহাওয়া অধিদপ্তরের বরাত দিয়ে বলেন, এমনিতেই টানা বৃষ্টিতে হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধের মাটি দুর্বল হয়ে আছে। উজানের ঢল নামলে সেই ঢলের চাপ অনেক বাঁধ এখন আর সামলাতে পারবে না।
কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, যেসব অঞ্চলে ধান আগে কাটার উপযোগী সেখানে পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে হার্ভেস্টার ও শ্রমিক এনে ধান কাটার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কোনোভাবেই যেন ফসল নষ্ট না হয়, সেদিকে সর্বোচ্চ নজর দিতে হবে।
