Logo
×

Follow Us

ভিডিও

ক্ষতি এড়ানো যাচ্ছে, ভালো দামও মিলছে

ছোট হিমাগারে বড় স্বস্তি

Icon

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৬ এপ্রিল ২০২৬, ২৩:৪৩

চুয়াডাঙ্গার জীবননগরের মানিকপুর গ্রামের তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা সজল আহমেদ। এবারই প্রথম তাঁর জমিতে স্থাপন করেছেন মিনি কোল্ডস্টোরেজ বা ছোট হিমাগার। ভরা মৌসুমে যখন দাম পাচ্ছিলেন না, তখন আট থেকে ১০ টন ধারণক্ষমতার এই হিমাগারে তিনি থরে থরে সাজিয়ে রেখেছিলেন  কমলা, মালটা, ড্রাগনসহ নানা ফল। ২০ দিন পর হিমাগার খুলে দেখলেন কমলা, মালটা কিংবা ড্রাগন ফল একদম তরতাজা। পরে এসব ফল ভালো দামে বাজারে বেচে আনন্দে মাতেন এই উদ্যোক্তা।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ‘জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় সাশ্রয়ী কোল্ডস্টোরেজ প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে কৃষকের আয় বৃদ্ধি প্রকল্প’-এর মাধ্যমে সজল আহমেদ এই ফারমার্স মিনি কোল্ডস্টোরেজের খোঁজ পান। প্রকল্প থেকে বলা হয়, দাম কমে গেলে কিংবা যে কোনো দুর্যোগে সর্বোচ্চ দুই মাস পর্যন্ত এই হিমাগারে সবজি বা ফল সংরক্ষণ করা যাবে। 

সম্প্রতি মানিকপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, হিমাগার থেকে ফল ও সবজি বের করে ঢাকার বাজারে পাঠানো হচ্ছে। সংরক্ষণের পরও পণ্যের গুণগত মান অটুট। সজল আহমেদ সমকালকে বলেন, সাধারণ ফ্রিজে রাখলে ফলের খোসা শুকিয়ে যায়; কিন্তু এখানে তা হয়নি। আগে দাম কম থাকলে বাধ্য হয়ে বিক্রি করতে হতো। এখন সংরক্ষণ করতে পারছি। এতে ক্ষতি এড়ানো যাচ্ছে, ভালো দামও মিলছে। 

মানিকগঞ্জের নিভৃত গ্রাম মেদুলিয়া। ‘সবজির গ্রাম’ হিসেবে পরিচিত এই এলাকায় কৃষকের উৎপাদিত সবজি নষ্ট হতো মাঠেই। এক বছর আগেও দেড় কেজি ওজনের প্রতিটি ফুলকপি ও বাঁধাকপি পাইকারি বাজারে বিক্রি হতো আড়াই থেকে তিন টাকায়। চাষাবাদের খরচ তো দূরের কথা; মাঠ থেকে সবজি ওঠানো ও বাজারে নেওয়ার খরচও তুলতে পারতেন না কৃষক। ফুলকপি ও বাঁধাকপি চাষ করে নিশ্চিত লোকসানে তারা বুক চাপড়াতেন। সেই মেদুলিয়া আজ আর আগের মতো নেই। একটি মাত্র কোল্ডস্টোরেজেই ছোট্ট গ্রাম বদলে গেছে। মূল সড়কের পাশে একটি ফাঁকা জায়গায় গত বছর সরকার কৃষক সমিতিকে মিনি কোল্ডস্টোরেজ নির্মাণ করে দেয়। সেখানে এখন প্রতিদিন ট্রাক আসে, সবজি ওঠানামা হয়। এই মিনি কোল্ডস্টোরেজ স্থাপনের সময় স্থানীয় ২০ কৃষককে নিয়ে গড়ে ওঠে মেদুলিয়া সমন্বিত কৃষি উন্নয়ন সংঘ। তারা সম্মিলিতভাবে এর পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নেন। 

শুরুতে অনেকেই সন্দিহান ছিলেন, সংরক্ষণ করে কি লাভ হবে? দ্রুত সেই সন্দেহ কেটে যায়। শুধু সংরক্ষণেই থেমে থাকেননি মেদুলিয়ার কৃষকরা। মিনি কোল্ডস্টোরেজের পাশেই তারা গড়ে তুলেছেন সবজির কালেকশন সেন্টার। এখান থেকেই স্থানীয় কৃষকের উৎপাদিত সবজি ও ফল ট্রাকে তুলে সরাসরি ঢাকার পাইকারি বাজারে পাঠানো হয়। বাজারে চাহিদা কম থাকলে কৃষকরা আর বাধ্য হয়ে বিক্রি করেন না। অবিক্রীত সবজি কোল্ডস্টোরেজে সংরক্ষণ করে রাখেন। বাজার পরিস্থিতি অনুকূলে এলে আবার পাঠানো হয় ঢাকায়। মিনি কোল্ডস্টোরেজ ঘিরে গ্রামটি একটি ছোট কৃষি অর্থনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।  

জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের অর্থায়নে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে বাস্তবায়িত প্রকল্পের মাধ্যমে ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন জেলায় ১০০টি ফারমার্স মিনি কোল্ডস্টোরেজ স্থাপন করা হয়েছে। প্রকল্পটি শুরু হয় ২০২৫ সালের জুনে। প্রথম প্রকল্পের সাফল্য দেখে সরকার আরও ৮০টি মিনি কোল্ডস্টোরেজ স্থাপনের প্রকল্প হাতে নেয়, যার নির্মাণকাজ এখন চলছে।

এ প্রকল্পের লক্ষ্য, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা করে কৃষকের আয় বাড়ানো। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে কৃষক পর্যায়ে ছোট কোল্ডস্টোরেজ সাধারণ বিষয় হলেও দেশে এটিই প্রথম সরকারি উদ্যোগ। এই ছোট হিমাগারে টমেটো, ফুলকপি, মরিচ, লাউ, আম, ড্রাগন ফলসহ নানা ফসল এক মাসের বেশি সংরক্ষণ করা যাচ্ছে।

যেভাবে চলছে প্রযুক্তি

দুটি মডেল– ঘরভিত্তিক (টিএসসিআর) ও কনটেইনারভিত্তিক (টিএসসিসি)। উভয়ই সোলার সিস্টেমে চালিত, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব। তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণের জন্য রয়েছে বিশেষ সেন্সর, যা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে সহজেই পরিচালনা করা যায়। কয়েকদিন থেকে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত সবজি ও ফল তাজা রাখার সুযোগ করে দিয়েছে এই প্রযুক্তি।

এই প্রযুক্তি কৃষকের ঘরেই স্থাপন সম্ভব। মাত্র পাঁচ লাখ টাকায় তৈরি করা যাচ্ছে একটি হিমাগার, রাখা যাবে ১০ টন পণ্য। কনটেইনারভিত্তিক সৌরচালিত সংস্করণের খরচ ১৫ লাখ টাকা। প্রচলিত কোল্ডস্টোরেজের চেয়ে খরচ প্রায় ৭০ শতাংশ কম।

সোলার মিনি কোল্ডস্টোরেজ শুধু কৃষকের আয়ই বাড়াচ্ছে না, পরিবেশও রক্ষা করছে। বছরে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কেজি কার্বন ডাইঅক্সাইড নিঃসরণ কমাতে পারে এই ব্যবস্থা, যা ১৪০-১৬০টি পূর্ণবয়স্ক গাছের বার্ষিক কার্বন শোষণের সমান। কোল্ডস্টোরেজগুলো দিনে সৌরবিদ্যুৎ, রাতে বিদ্যুতে চলছে। 

ছোট্ট হিমাগারে বড় সুরক্ষা

প্রাথমিকভাবে যেসব এলাকায় সবজি চাষ বেশি হয়, সেসব গ্রামে চাষিরা সংগঠন বা সমিতি গঠন করে প্রশিক্ষণ দিয়ে এই কোল্ডস্টোরেজ দেওয়া হচ্ছে বিনামূল্যে। কৃষকরাই রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব থাকছেন, তবে সার্বিক তদারকি করছে কৃষি বিভাগ। 

নীলফামারীর কৃষি উদ্যোক্তা এ আর মামুন জানান, দেশি মালটার দাম যখন ছিল মাত্র ৬০ থেকে ৬৫ টাকা কেজি, তখন বাজারে বিক্রি করলে লোকসান হতো। অনেক কৃষক তখন মালটা বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন। আমি তখন মালটা সংরক্ষণ করি ফারমার্স মিনি কোল্ডস্টোরেজে। প্রায় আড়াই মাস পর বাজারে মালটার চাহিদা বাড়লে সেই মালটাই বিক্রি হয় ২০০ টাকা কেজি দরে। নীলফামারীর এই কোল্ডস্টোরেজে শুধু মামুন নন, আশপাশের কৃষকরা ফুলকপি, বাঁধাকপি, বেগুন, মরিচ, টমেটো সংরক্ষণ করছেন। মামুন বলেন, এই স্টোরেজ কৃষকের ভয় দূর করেছে। আগে ভাবতাম, আজ বিক্রি না করলে কাল নষ্ট হবে। এখন জানি, সময় আমার পক্ষে।

ঝিনাইদহ সদরের তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা আহসানুল ইসলাম একটি গ্রুপভিত্তিক মিনি কোল্ডস্টোরেজ পরিচালনা করছেন। তাঁর নেতৃত্বে স্থানীয় কৃষকরা ড্রাগন ফল, পেয়ারা, গাজর, ফুলকপি, শসা, টমেটো সংরক্ষণ করছেন। আহসানুল ইসলাম বলেন, এই স্টোরেজ কৃষককে হিসাব শেখাচ্ছে। কখন বিক্রি করলে লাভ হবে, কখন অপেক্ষা করা উচিত– এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাই সবচেয়ে বড় পরিবর্তন।

মানিকগঞ্জের সিংগাইরের মো. আতিক হোসেন দুই মাস আগে সাড়ে আট টন মালটা সংরক্ষণ করেছিলেন। তখন বাজারে দেশি মালটার দাম কম ছিল। পরে যখন বাজারে মালটার সংকট তৈরি হয়, তখন সংরক্ষিত মালটা বিক্রি করে তিনি প্রায় চার লাখ ৮০ হাজার টাকা মুনাফা করেন।

কমবে অপচয়

কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় দুই কোটি ৫০ লাখ টন সবজি উৎপাদিত হয়। সংরক্ষণ সুবিধার অভাবে এর একটি বড় অংশ নষ্ট হয়ে যায়। গবেষকদের মতে, বাংলাদেশে ফসল কাটার পর থেকে ভোক্তার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ সবজি নষ্ট হয়। বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) এক গবেষণায় দেখা গেছে, পেঁয়াজে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ, আমে ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ, কলা, পেঁপে, পেয়ারা ও লিচুতে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ, ধানে ৮ থেকে ৯ শতাংশ, ডালে ৬ থেকে ৭ শতাংশ, আলুতে ১০ শতাংশ এবং আদায় ৫ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতি হয়। এই ১০টি ফসলের মোট উৎপাদন পাঁচ কোটি ২৫ লাখ ৭০ হাজার টন, যার মধ্যে প্রতিবছর প্রায় ৫১ লাখ ৩০ হাজার টন নষ্ট হয়।

কৃষি কর্মকর্তারা জানান, কৃষক পর্যায়ে মিনি কোল্ডস্টোরেজ চালু হলে এই অপচয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

কৃষি মন্ত্রণালয় জানায়, গত বছর শীতে সবজির দাম ধসে পড়ায় কৃষকের তীব্র ক্ষোভের পর এই উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রথমে একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্প চালু করা হয়। সাভারের রাজালাখ উদ্যানতত্ত্ব কেন্দ্রে একটি কোল্ডস্টোরেজ স্থাপন করা হয়। বাইরে সৌরচালিত কনটেইনারভিত্তিক আরেকটি ইউনিট বসানো হয়। আট মাস পরীক্ষামূলক ব্যবহারের পর এখন তা কৃষকদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

প্রকল্প পরিচালক তালহা জুবাইর মাসরুর বলেন, এই প্রযুক্তি শুধু কৃষকের জন্য নয়, ভোক্তার জন্যও উপকারী। এটি কৃষকের বাড়িতেই স্থাপন করা যায় এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলেও সম্প্রসারণের সুযোগ আছে।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বাংলাদেশের কৃষিতে সবচেয়ে বড় সমস্যার একটি ফসল কাটার পর সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাব। এতে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কৃষিপণ্য নষ্ট হয়। এই সমস্যা সমাধানে মিনি কোল্ডস্টোরেজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এই প্রযুক্তি বিস্তৃত হলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে। ফসলের অপচয় কমবে, কৃষকের আয় বাড়বে, গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী হবে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান বলেন, কৃষি উৎপাদন বাড়লেও সংরক্ষণের অভাবে কৃষক ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন। মিনি কোল্ডস্টোরেজ শুধু ফসল নষ্ট কমাবে না, বরং কৃষককে বাজার ব্যবস্থাপনায় সক্ষম করে তুলবে।

কৃষি, খাদ্য এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী আমিন-উর রশীদ বলেন, মিনি কোল্ডস্টোরেজের বিষয়ে আমি জেনেছি। কৃষকের আয় বাড়াতে, ফসলের অপচয় কমানো এবং গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে এটি ভালো পদক্ষেপ। আমরা কৃষকের সুরক্ষায় এমন ছোট সংরক্ষণাগারের পাশাপাশি আরও ভালো পদক্ষেপ নেওয়ার উদ্যোগ নেব। এতে কৃষি হবে আরও লাভজনক ও টেকসই।

Logo