মাঠে যাচ্ছে রোগমুক্ত চারা
কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা টিস্যু কালচার
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ১৭:০৭
একটি ছোট্ট কাচের বয়াম। ভেতরে স্বচ্ছ জেলির মতো এক ধরনের মাধ্যম। তার ওপর কোনো মাটি ছাড়াই রাখা গাছের অতি ক্ষুদ্র একটি টিস্যু। চোখে প্রায় ধরা পড়ে না। সেই টুকরো থেকেই জন্ম নিচ্ছে শত শত রোগমুক্ত চারা। সেগুলো যায় কৃষকের মাঠে। হয়ে উঠছে ফলভরা গাছ। মাদারীপুর হর্টিকালচার সেন্টারে টিস্যু কালচার ল্যাবের গবেষকরা এমন অসাধ্য কাজ করে চলেছেন।
জেলার মোস্তফাপুর এলাকায় আছে এই ল্যাবরেটরি। এটি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি কাম হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন ও উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে পরিচালিত হয়। এ ল্যাবে গবেষণা করে উন্নত প্রজাতির এবং মান সম্পন্ন গাছ উৎপাদনের জন্য পিতৃ-মাতৃ গাছের চারা উৎপাদন করা হয়। জি-৯ কলা, এমডি-২ আনারস, স্ট্রবেরি, জারবেরা, অর্কিড, স্টিভিয়া, আলুসহ ভিবন্ন ফসলের চারা উৎপাদিত হচ্ছে সম্পূর্ণ জীবাণুমুক্ত পরিবেশে, নিয়ন্ত্রিত আর্দ্রতা-তাপমাত্রার মধ্যে। এক বছরেরও কম সময়ে এই ল্যাব থেকে ৪০ হাজার চারা উৎপাদন হয়েছে। এরমধ্যে ২০ হাজার চারা কৃষক মাঠে চাষ করে লাভবান হচ্ছেন। এই ল্যাব শুধু গবেষণাগার নয়, এটি বাংলাদেশের কৃষির নীরব রূপান্তরের কেন্দ্র। যেখানে মাটি ছাড়া গাছ জন্মায়, কিন্তু সেই গাছই গিয়ে মাটির উৎপাদনশীলতা বাড়াচ্ছে।
ল্যাবে জীবানুমুক্ত চারা উৎপাদনের লড়াই
ল্যাবের ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে শৃঙ্খলা। এখানে কোনো কাজেই তাড়াহুড়োর জায়গা নেই। প্রতিটি ধাপ হিসাব করে, মাপজোক করে, নিয়ম মেনে বিজ্ঞানসম্মতভাবে করতে হয়। ল্যাবের দায়িত্বে আছেন কৃষিবিদ মো. এনামুল হক। তিনি জানান, ল্যাবের প্রতিটি কাজ গুণগতমান বজায় রেখে এমন নির্দিষ্ট মানদণ্ড মেনে করা হয়। সামান্য কোনো ত্রুটি থাকলে গোটা প্রক্রিয়াই নষ্ট হয়ে যাবে। তাই ল্যাবে প্রবেশ করার আগে প্রত্যেকের হাত-পা ভালো করে ধুয়ে পরিষ্কার করে প্রবেশ করতে হয়। সেসঙ্গে গাছের টিস্যুগুলো যেসব বয়ামের ভেতরে রেখে চারা উৎপাদন করা হয়, সেগুলোকে প্রথমে ভালো করে পরিষ্কার করে ধুয়ে নেওয়া হয়। এর পরবর্তী ধাপে অটোক্ল্যাপ মেশিন ও ড্রায়ার মেশিনের মাধ্যমে পানি শুকিয়ে নেওয়া হয়।
এনামুল হক বলেন, এ ল্যাবে যা কাজ হয় তার সবটাই ডিস্টিল ওয়াটার দিয়ে করা হয়। তাই ল্যাবের ভেতরে রয়েছে ডিস্টিল ওয়াটার তৈরির একটি ইউনিট। তাছাড়া পানির অম্লত্ব মাপার জন্য রয়েছে অত্যাধুনিক পিএইচ মিটার। এরপরের ধাপে আলট্রা ভায়োলেট আলোর মাধ্যমে সব ধরনের ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করা হয়। সেসঙ্গে হেপা ফিল্টারের মাধ্যমে ছোট থেকে ছোট ধূলিকণাকেও আটকে দেয়।
সরেজমিন দেখা যায়, ল্যাবে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত আলোতে কয়েক হাজার কাচের বয়ামের মধ্যে টিস্যু রাখা হয়েছে। যেগুলো স্তরে স্তরে সাজানো আছে। এই টিস্যুগুলো থেকে নিয়ন্ত্রিত আলো ও আবহাওয়ায় গাছের জন্ম নেয়। যা পরবর্তীতে মাঠে বা জমিতে লাগানো হয়।
এখন অনেকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে, আলু কিংবা কলা চারা থেকেই উৎপাদন করা সম্ভব কিনা? ল্যাবের প্রয়োজন কি? এর উত্তর- একটি কলা কিংবা অন্য ফলের গাছের কন্দ থেকে সাধারণ পদ্ধতিতে একটি গাছের জন্ম হয়। কিন্তু টিস্যু কালচার পদ্ধতিতে একটি কলার কন্দ থেকে কয়েকশ চারা উৎপাদন করা সম্ভব। ল্যাবে উৎপাদিত চারাগুলো সম্পূর্ণভাবে রোগমুক্ত এবং স্বাস্থ্যকর হয়ে থাকে। তাই এগুলো থেকে ভালো মানের ফলন নিশ্চিত।
ধাপে ধাপে বেড়ে উঠছে জীবন
একটি কলাগাছের শুট টিপ বা টিস্যু সংগ্রহ করে প্রথমে জীবাণুমুক্ত করা হয়। তারপর সেটিকে একটি পুষ্টিসমৃদ্ধ কৃত্রিম মিডিয়ার মধ্যে রাখা হয়। সেখানে থাকে বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদ হরমোন, যা কোষ বিভাজনকে ত্বরান্বিত করে। এই কোষগুলো ধীরে ধীরে বিভাজিত হয়ে তৈরি করে ছোট ছোট মাইক্রো-শুট। এরপর আরেক ধাপে হরমোন ব্যবহার করে তৈরি করা হয় শিকড়। তখন এটি ল্যাবের নিয়ন্ত্রিত পরিবেশের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ চারা হিসেবে গড়ে ওঠে।
কিন্তু এখানেই শেষ নয়। ল্যাবের ভেতরে বড় হওয়া এই চারাগুলো সরাসরি মাঠে টিকতে পারে না। তাই এগুলোকে ধাপে ধাপে বাইরের পরিবেশে অভ্যস্ত করা হয়- পলি হাউজে, কোকোপিটের ট্রেতে, নিয়ন্ত্রিত আর্দ্রতায়। যখন গাছগুলো শক্ত হয়, তখনই সেগুলো কৃষকের হাতে তুলে দেওয়া হয়। সাধারণ পদ্ধতিতে একটি কলার কন্দ থেকে একটি গাছ হয়। টিস্যু কালচারে সেই একই কন্দ থেকে উৎপাদন করা যায় কয়েকশ চারা।
কৃষিবিদ মো. এনামুল হক বলছিলেন, আমরা আসলে মাতৃগাছের ক্লোন তৈরি করছি। ফলে প্রতিটি গাছ একই মানের, একই বৈশিষ্ট্যের হয়। ল্যাবে উৎপাদিত চারাগুলো সম্পূর্ণ রোগমুক্ত। ফলে মাঠে গিয়ে এগুলো দ্রুত বাড়ে, ফলন বেশি দেয় এবং রোগবালাইয়ের ঝুঁকি কম থাকে। কৃষকের উৎপাদন খরচ কমে যায়, আর লাভ বাড়ে।
টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি কাম হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন ও উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে মাদারীপুর ছাড়াও বগুড়ার বনানী আর ময়মনসিংহের কেওয়াটখালী হর্টিকালচার সেন্টারের ল্যাবেও প্রতিদিনই জন্ম নিচ্ছে রোগমুক্ত, উচ্চফলনশীল চারা। এসব চারা দেশের বিভিন্ন হর্টিকালচার সেন্টারের মাধ্যমে চলে যাচ্ছে কৃষকের মাঠে।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে টিস্যু কালচারের মাধ্যমে উৎপাদিত চারা জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। টাঙ্গাইলের মধুপুরের যদুনাথপুর ইউনিয়নের ইখরিয়াবাড়ী গ্রামের কৃষক মো. ওয়াদুদ হোসনে বলেন, আমি টিস্যু কালচারের জি-নাইন কলা চাষ করেছি। কলা অতি অল্প সময়ে ফলন দেয়, ফলের সংখ্যা অন্য স্থানীয় জাত থেকে প্রায় দ্বিগুণ, গাছের উচ্চতা কম হওয়া সহজে হেলে পরে না। টিস্যু কালচার পদ্ধতিতে উদ্ভাবিত এই কলা গাছে রোগবালাই কম। গাছও মজবুত, ঝড়েও পড়ে না। বাজারে দামও থাকে ভালো।
গবেষণা, শিক্ষা আর কৃষকের সেতুবন্ধন
দেশে টিস্যু কালচার নিয়ে আগে যতটা কথা হতো, তার বেশিটাই গবেষণা আর সম্ভাবনার পর্যায়ে সীমাবদ্ধ ছিল। এখন ছড়িয়ে পড়েছে মাঠে। একটু একটু করে কৃষি পুরোনো খোলস ছাড়ছে। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি আর কৃষকের হাতে-কলমে দক্ষতা তৈরির মাধ্যমে নতুন পথের যাত্রা শুরু হয়েছে। এই পথচলায় বড় ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে শুরু হওয়া টিস্যু কালচার প্রকল্প। কিছুদিন আগেও জারবেরা ফুলের চারার জন্য কৃষকদের পুরোপুরি নির্ভর করতে হতো ভারতের ওপর। এমডি-২ আনারসের সাকার আসত ফিলিপাইন থেকে। সেই নির্ভরতা এখন অনেকটাই কমে এসেছে। ল্যাবে উৎপাদিত চারাগুলো শুধু সহজলভ্যই হয়নি, মানের দিক থেকে কৃষকদের ভরসা জুগিয়েছে আরও বেশি। প্রকল্পের তিনটি ল্যাব ইতোমধ্যে পৌনে ২ লাখ চারা তৈরি করেছে।
সংশ্লষ্টিরা বলছেন, প্রকল্পের অধীনে নির্মাণাধীন বান্দরবানের বালাঘাটা, সাভারের রাজালাখ, কুমিল্লা, ভোলা চরফ্যাশন ও টাঙ্গাইলের ধনবাড়ি হর্টিকালচার সেন্টারের ল্যাবগুলো পুরোপুরি চালু হলে চারা উৎপাদন আরও বাড়বে। তখন উচ্চমূল্যের চারায় বিদেশনির্ভরতা কমবে। বহুতল এসব ল্যাবে থাকবে সব আধুনিক ব্যবস্থা।
টিস্যু কালচার প্রকল্প শুধু চারা উৎপাদন নয় দেশের হর্টিচালচারগুলোর উন্নয়নেও কাজ করছে। একইভাবে মাঠ পর্যায়ে চারা ছড়িয়ে দেওয়া, কৃষি উদ্যোক্তা তৈরির প্রশিক্ষণ, উত্তম কৃষি চর্চায় চাষাবাদ ও টিস্যুকালচারবিষয়ক গবেষণায় শিক্ষার্থীদের পেছনে বিনিয়য়োগ করছে। এই প্রকল্পের অর্থায়নে কেউ গবেষণা করেছেন জারবেরা ফুলের চারা উৎপাদনের পদ্ধতি নিয়ে, কেউবা কাজ করেছেন আনারসের উন্নত চারা তৈরির উপায় বের করতে। কারও গবেষণার বিষয় মিষ্টি আলুর চারা উৎপাদন, সুগারবিটের চারা তৈরির কৌশল। বাদ পড়েনি অর্কিড, আদা, সবরি কলা, স্ট্রবেরি, গ্লাডিওলাস, স্টেভিয়াও।
টিস্যু কালচার প্রকল্পের অর্থায়নে গবেষণাপত্র তৈরি করেছিলেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মাজহারুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘প্রতিকূল প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের লড়তে হবে। লবণাক্ততা, বন্যা, খরা তো আছেই। রোগজীবাণুকে কীটনাশক ছাড়া প্রযুক্তি দিয়ে দমন করার কৌশল বের করতে হবে। আমাদের আশা, কৃষক এই গবেষণার সুফল পাবেন।’
টিস্যু কালচার প্রকল্পের পরিচালক তালহা জুবায়ের মাশরুর বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ও মাঠ পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তাদের মধ্যে সংযোগ তৈরি হচ্ছে এই প্রকল্পের মাধ্যমে। ফলে গবেষণাগার আর কৃষিজমির মধ্যে আর কোনো দূরত্ব থাকবে না। একটা সময় ছিল যখন উন্নত জাতের রোগমুক্ত চারা ছিল দুর্লভ, এখন সেই চারাই হবে কৃষকের জন্য সহজলভ্য। দেশের অধিকাংশ জেলার চাষিরা টিস্যু কালচার চারা চাষ করে ব্যাপক লাভবান হচ্ছেন। যেমন টিস্যু কালচারে উৎপাদিত জি-৯ কলা প্রচলিত পদ্ধতির চেয়ে ৪০ শতাংশ বেশী লাভ করা সম্ভব। টিস্যু কালচার পদ্ধতিতে উন্নতমানের রপ্তানীযোগ্য ফসল উৎপাদন করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব।
স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্ত কৃষি বিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. এম এ রহিম বলেন, টিস্যু কালচার আমাদের দেশের কৃষিতে বিপ্লব ঘটাতে পারে। ভাইরাসমুক্ত ও উন্নতমানের চারা উৎপাদনের ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তির বিকল্প এখনো সীমিত। সাধারণ গ্রাফটিং বা প্রাকৃতিক প্রজনন পদ্ধতিতে অনেক সময় রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না। কিন্তু টিস্যু কালচারের মাধ্যমে নির্ভরযোগ্য, রোগমুক্ত এবং মানসম্পন্ন চারা উৎপাদন করা যায়। যা কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন এনেছে। যেসব ফসল সহজে বংশবিস্তার করা যায় না কিংবা বৃহৎ পরিসরে উৎপাদন করা কঠিন সেগুলোর জন্য টিস্যু কালচার অত্যন্ত কার্যকর। একইভাবে উচ্চমূল্যের এবং সীমিত প্রাপ্যতার চারা উৎপাদনেও এই প্রযুক্তি বড় ভূমিকা রাখছে।
তিনি বলেন, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়াসহ নানা দেশ এই প্রযুক্তির সফল ব্যবহার করছে। আমরা যদি নেদারল্যান্ডের দিকে যাই, তাদের টিউলিপ বলি, নার্সারি বলি—সবকিছুরই চারা টিস্যু কালচারের মাধ্যমে হচ্ছে। বাংলাদেশে টিস্যু কালচার প্রকল্পের আওতায় এখন কলা, স্ট্রবেরিসহ বিভিন্ন ফসলের টিস্যু কালচার চারা উৎপাদন শুরু হয়েছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় টিস্যুকালচার ল্যাবরেটরি নির্মাণ হচ্ছে। ভবিষ্যতে এসব ল্যাব পূর্ণ সক্ষমতায় পৌঁছালে দেশে বিপুল পরিমাণ মানসম্পন্ন চারা উৎপাদন সম্ভব হবে।
