Logo
×

Follow Us

বিশেষ প্রতিবেদন

প্রশিক্ষণে তৈরি হচ্ছে নতুন প্রজন্মের কৃষক

Icon

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৬ এপ্রিল ২০২৬, ২৩:৩২

কৃষি মানেই বাপদাদার পেশা, পুরোনো নিয়মে চাষাবাদ, পেটেভাতে জীবন চালানো– এই ধারণা এখনও অনেকের মধ্যে আছে। তবে ঝিনাইদহ সদরের বাজার গোপালপুরের আহসানুল ইসলাম ডন সেই ধারণা ভেঙে দিয়েছেন। তাঁর খামারে ঢুকলেই বোঝা যায়, এটি আর আগের মতো কৃষি নয়। সারি সারি ড্রাগন ফলের গাছ, একটু দূরে অ্যাভোকাডো, অন্য পাশে আখ। আছে আম, লিচু, পেয়ারা। এক জমিতেই এত বৈচিত্র্য!

তবে ডনের সময় এমন ছিল না। এক সময় ডনও ছিলেন একজন সাধারণ চাষি। জমি ছিল, অভিজ্ঞতা ছিল, কিন্তু বড় করে ভাবার সুযোগ বা দিকনির্দেশনা ছিল না। এখন তিনি একজন সফল কৃষি উদ্যোক্তা। তিনি জানেন কোন ফসল কখন লাগাতে হয়, কোথায় বিক্রি করলে ভালো দাম পাওয়া যাবে, কীভাবে ঝুঁকি কমিয়ে আয় বাড়ানো যায়।

‘হাজিরা অ্যাগ্রো অ্যান্ড ফুড প্রসেসিং’ নামে তাঁর খামার এখন ঝিনাইদহ সদর ও কালীগঞ্জের তিনটি স্থানে ছড়িয়ে আছে। প্রায় ৭০ বিঘা জমিতে গড়ে ওঠা এই খামার এখন সমন্বিত কৃষি ব্যবসার মডেল। এখানে শুধু ফসল ফলানো হয় না। নতুন জাত নিয়ে পরীক্ষা হয়, বাজার বিশ্লেষণ হয়, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করা হয়। এই উদ্যোগে এখন প্রায় ২০ জন মানুষের স্থায়ী কাজের ব্যবস্থা হয়েছে। আশপাশের গ্রামেও এর প্রভাব পড়ছে– কেউ শ্রমিক হিসেবে কাজ পাচ্ছেন, কেউ সরবরাহকারী হিসেবে যুক্ত হচ্ছেন।

নিজের এই বদলে যাওয়ার গল্প বলতে গিয়ে ডন বলেন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি ও হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন ও উন্নয়ন প্রকল্পের তিন দিনের আবাসিক প্রশিক্ষণ আমাকে শুধু চাষি থেকে উদ্যোক্তায় পরিণত করেনি, বরং দেশের বিভিন্ন জেলার কৃষি উদ্যোক্তাদের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। এখন আমরা নিয়মিত একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখি, অভিজ্ঞতা বিনিময় করি এবং প্রয়োজনে পরামর্শ দিয়ে একে অপরকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করি। এই নেটওয়ার্কটাই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।

তিনি বলেন, প্রশিক্ষণের সময় রিসোর্স পারসন দেশবরেণ্য কৃষিবিজ্ঞানীর কাছ থেকে সাহস পাই উচ্চমূল্যের ফসল চাষ করতে। আগে ২৫ বিঘা জমিতে আম-লিচুসহ বিভিন্ন ফলের চাষ ছিল। এখন প্রায় ৭০ বিঘা জমিতে পরিকল্পিতভাবে ড্রাগন, অ্যাভোকাডো, ফিলিপাইনের কালো আখ, পেয়ারা, আম, লিচু, গম, সরিষা ও ভুট্টা চাষ করছি।

ডনের মতো গল্প এখন দেশের নানা জায়গায় দেখা যাচ্ছে। ময়মনসিংহের রাসেল মাহবুব প্রশিক্ষণে এসেছিলেন নিজের ছোট খামার একটু বড় করার আশায়। প্রশিক্ষণের পর তাঁর সেই ভাবনা বদলে যায়। এখন তিনি উচ্চমূল্যের ফল চাষ করছেন এবং নিজের পণ্য অন্য জেলাতেও পাঠাচ্ছেন।

চুয়াডাঙ্গার সজল মিয়া ও হাফেজ আবদুল কাদির সোহান একসঙ্গে কাজ শুরু করেছেন। একজন উৎপাদনের দিকে মন দিয়েছেন, অন্যজন বাজারজাতকরণে। এই ভাগাভাগি কাজই তাদের উদ্যোগকে দ্রুত লাভজনক করেছে। টাঙ্গাইলের ইলিয়াস হোসেন নার্সারি ব্যবসায় সফলতা পেয়েছেন। উন্নত চারা উৎপাদন করে তিনি এখন আশপাশের কৃষকের কাছে সরবরাহ করেন। রাজশাহীর রাজু আহমেদ প্রক্রিয়াজাতকরণে এগিয়েছেন। মৌসুমি ফল সংরক্ষণ করে সারা বছর বাজারে বিক্রি করছেন।

এভাবে টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি ও হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন ও উন্নয়ন প্রকল্পের তিন দিনের আবাসিক প্রশিক্ষণ অনেক তরুণের চিন্তাভাবনা বদলে দিয়েছে। এই প্রশিক্ষণের আরেকটি শক্ত ভিত হলো এর বাস্তবমুখী ও ব্যবহারিক পদ্ধতি। আবাসিক এই প্রশিক্ষণটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে সাভারের রাজালখ হর্টিকালচার সেন্টারে, যেখানে প্রশিক্ষণার্থীদের থাকা ও শেখার পুরো ব্যবস্থাই একই স্থানে। ফলে তারা একটি নিবিড় ও মনোনিবেশপূর্ণ শিক্ষার পরিবেশে সময় কাটানোর সুযোগ পাচ্ছেন। হর্টিকালচার সেন্টারের মধ্যেই প্রশিক্ষণ পরিচালিত হওয়ায় অংশগ্রহণকারীরা সরাসরি মাঠ পর্যায়ে গ্রাফটিং, প্রোপাগেশন, নার্সারি ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন উদ্যান ফসলের পরিচর্যা হাতে-কলমে শিখতে পারছেন।

হাতে-কলমে শেখার সুযোগ

বাংলাদেশে কৃষি প্রশিক্ষণ নতুন কিছু নয়। অনেক বছর ধরেই বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তা তত্ত্বেই সীমাবদ্ধ থাকে। এখানেই ভিন্নতা এনেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের এই প্রকল্প। সাভারের রাজালখ হর্টিকালচার সেন্টারে তিন দিনের আবাসিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এখানে অংশগ্রহণকারীরা শুধু ক্লাস করেন না– তারা মাঠে নেমে কাজ করেন। গাছের কলম করা, চারা তৈরি, নার্সারি পরিচালনা– সবই হাতে-কলমে শেখানো হয়। ভার্মি কম্পোস্ট তৈরি থেকে শুরু করে আধুনিক সংরক্ষণ প্রযুক্তি– সবকিছু তারা নিজের চোখে দেখেন, হাতে করে শেখেন। এর পাশাপাশি সফল খামার, প্যাকিং হাউস, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং পাইকারি বাজার পরিদর্শনের সুযোগ দেওয়া হয়। ফলে উৎপাদন থেকে বিক্রি– পুরো প্রক্রিয়াটা তাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়।

সাড়ে ৭ হাজার উদ্যোক্তা তৈরি লক্ষ্য

এই প্রকল্পের আওতায় ৭ হাজার ৫০০ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এরই মধ্যে ৩ হাজার ৪০০ জন প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। সাধারণত প্রশিক্ষণ শেষ হলেই সম্পর্ক শেষ হয়ে যায়। তবে এখানে প্রশিক্ষণ শেষে অংশগ্রহণকারীরা যুক্ত থাকছেন একটি নেটওয়ার্কে। হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুক এবং ওয়েব প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তারা নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। কেউ সমস্যায় পড়লে অন্যরা সাহায্য করছেন। কেউ নতুন কিছু শিখলে তা সবার সঙ্গে ভাগ করে নিচ্ছেন। এই নেটওয়ার্ককে আরও এগিয়ে নিতে একটি আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স–কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) মোবাইল অ্যাপ তৈরির কাজ চলছে। এই অ্যাপের মাধ্যমে কৃষকরা ভবিষ্যতে রোগবালাই শনাক্ত, বাজারদর জানা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুবিধা পাবেন।

প্রকল্প পরিচালক তালহা জুবাইর মাসরুর বলেন, প্রশিক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তরুণদের মধ্যে উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার মানসিকতা গড়ে তোলা। অংশগ্রহণকারীদের শেখানো হয় কৃষি শুধু জীবিকা নয়, বরং একটি লাভজনক ও পরিকল্পিত ব্যবসা হতে পারে। আধুনিক প্রযুক্তি, সঠিক ব্যবস্থাপনা ও বাজারভিত্তিক চিন্তার মাধ্যমে কম জমিতে অধিক উৎপাদন এবং বেশি আয় সম্ভব– এই ধারণা তাদের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করা হয়। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে টিস্যু কালচার প্রযুক্তির মাধ্যমে উন্নতমানের চারা ব্যবহারে জোর দেওয়া হচ্ছে। কলা, অর্কিড, জারবেরা, আনারসসহ বিভিন্ন ফসল দ্রুত ফলন দিচ্ছে এবং ভালো দাম পাওয়া যাচ্ছে।

বাংলাদেশে উৎপাদিত ফল ও সবজির বড় একটি অংশ সংগ্রহের পর নষ্ট হয়ে যায়। এই সমস্যা কমাতে প্রশিক্ষণে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে সংরক্ষণ, গ্রেডিং, সোর্টিং ও প্যাকেজিংয়ের ওপর। এছাড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ; যেমন শুকনা ফল, জুস, প্যাকেটজাত পণ্য–উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন বাজার তৈরি করছে। ফলে একই পণ্য থেকে বাড়তি আয় সম্ভব হচ্ছে। মধ্যস্বত্বভোগীর কারণে কৃষকরা অনেক সময় ন্যায্যমূল্য পান না। এই সমস্যার সমাধানে উদ্যোক্তাদের শেখানো হচ্ছে কীভাবে সরাসরি বাজারের সঙ্গে যুক্ত হতে হয়। পাইকারি বাজার, সুপারশপ এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্ম–সব জায়গায় কীভাবে পৌঁছাতে হয়, সেটিও শেখানো হচ্ছে।

মানিকগঞ্জের কৃষি উদ্যোক্তা আতিকুর রহমান বলেন, এই প্রশিক্ষণে নিজের মধ্যে নেটওয়ার্ক গড়ে উঠে। একজন উদ্যোক্তা অন্যজনের অভিজ্ঞতা থেকে শিখছেন। কেউ সমস্যায় পড়লে অন্যরা সমাধান দিচ্ছেন। কেউ সফল হলে তার গল্প অন্যদের অনুপ্রাণিত করছে। ফলে তৈরি হচ্ছে একধরনের সহযোগিতামূলক পরিবেশ।

নতুন প্রজন্ম, নতুন কৃষি

এই বছর স্বাধীনতা পদকজয়ী কৃষি গবেষক অধ্যাপক ড. এম এ রহিম শুরু থেকেই এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তিনি সমকালকে বলেন, এই উদ্যোগের মাধ্যমে আমরা শুধু তরুণদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছি না; বরং বাংলাদেশের কৃষিতে একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠা করছি। কৃষিকে এখন প্রযুক্তিনির্ভর, বাজারমুখী এবং পরিকল্পিত ব্যবসা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে– এই প্রশিক্ষণ সেই রূপান্তরের ভিত্তি তৈরি করছে। এর মাধ্যমে তৈরি হচ্ছে নেক্সট জেনারেশন ফারমার্স; যারা প্রযুক্তি ব্যবহার, বাজার বিশ্লেষণ এবং লাভজনক উদ্যোগ পরিচালনায় দক্ষ হয়ে উঠছে। তরুণদের এই অংশগ্রহণ ভবিষ্যতের কৃষিকে আরও আধুনিক, টেকসই ও সম্ভাবনাময় করে তুলবে।

Logo