উত্তম কৃষিচর্চা শুরু, চলতি বছর ৭৫ হাজার হেক্টর জমিতে চাষ
নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে নতুন উদ্যোগ
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৫, ২২:২৩
কৃষিতে শুধু উৎপাদন নয়, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করাটাও চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ২০২৮ সালের মধ্যে কৃষি মন্ত্রণালয় তিন লাখ হেক্টর জমিকে গুড এগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিসেস (গ্যাপ) বা উত্তম কৃষিচর্চার আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে। এর মাধ্যমে কৃষক থেকে শুরু করে বাজার পর্যন্ত পুরো উৎপাদন ও বিপণন প্রক্রিয়ায় সুশৃঙ্খল মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজ চলছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ‘প্রোগ্রাম অন এগ্রিকালচার অ্যান্ড রুরাল ট্রান্সফরমেশন ফর নিউট্রিশন, এন্টারপ্রেনরশিপ অ্যান্ড রেসিলিয়েন্স (পার্টনার)’ প্রকল্প গ্যাপভিত্তিক চাষাবাদের প্রক্রিয়া পরিচালনা করছে। এই প্রকল্প কৃষিপণ্যের মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রেখে চাষাবাদ শুরু করেছে।
এরই ধারাবাহিকতায় চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৭৫ হাজার হেক্টর জমিতে গ্যাপভিত্তিক চাষাবাদ চলবে। এর মধ্যে সবজির জন্য ৫০ হাজার আর ফলের জন্য ২৫ হাজার হেক্টর জমি নির্ধারণ করা হয়েছে। এ জন্য দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, রংপুর, পঞ্চগড়, জয়পুরহাট, বগুড়া, রাজশাহী ও মুন্সীগঞ্জ– এই আট জেলাকে দেওয়া হয়েছে অগ্রাধিকার। সবজি চাষের মধ্যে আলু ২০ হাজার হেক্টর; বেগুন, করলা, পেঁপে, কচুরলতি, বরবটি ও লাউ– প্রতিটির জন্য পাঁচ হাজার হেক্টর করে জমি বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ফলের মধ্যে আম ১৫ হাজার, আনারস দুই হাজার, পেয়ারা এক হাজার এবং লেবু দুই হাজার হেক্টরে উৎপাদন চলছে। চাষাবাদে এই বড় পরিবর্তন শুরু হয়েছে ‘পার্টনার ফিল্ড স্কুল’ নামে এক অনন্য শিক্ষাকেন্দ্র থেকে।
একেকটি স্কুলে ২৫ কিষান-কিষানি অংশ নিচ্ছেন। প্রতি স্কুলের অধীনে প্রদর্শনীর মাধ্যমে ১০ হেক্টর জমিতে গ্যাপ নীতিতে চাষ হচ্ছে। এসব জমিতে রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমানো, বালাই দমন এবং মাটি ও পানি কীভাবে স্বাভাবিক রাখা যায়, তা কৃষকরা সরাসরি দেখছেন। শেখানো হয় উৎপাদিত ফসলের পরবর্তী পরিচর্যা ও বাজার ব্যবস্থাপনা। প্রকল্প থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও উপকরণ। আর প্রশিক্ষণ শেষে কৃষকদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে গ্যাপ সনদ। স্কুলে প্রশিক্ষণ শেষে কৃষকসেবা কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়, যেখানে প্রশিক্ষণ নেওয়া কৃষকরাই অন্য কৃষককে পরামর্শ দিচ্ছেন।
পার্টনার প্রকল্পের আওতায় প্রশিক্ষণের পর গত অর্থবছরে গ্যাপ অনুসরণে ৩০০ একর জমিতে আম ও সবজি উৎপাদন হয়েছে। রপ্তানিও হয়েছে এসব কৃষিপণ্য। এ পর্যন্ত প্রশিক্ষণ পাওয়া ৩৮ কৃষক গ্যাপ সনদ পেয়েছেন। এই সনদ আগামীতে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য রপ্তানির পথ খুলে দেবে।
রাজশাহীর তানোরের কৃষক হাফিজুল ইসলাম গ্যাপ অনুসরণ করে সবজি চাষ করছেন। তিনি বলেন, ‘আগে কীটনাশক অনেক ব্যবহার করতাম। এখন পোকা দমনে ফেরোমন ট্র্যাপ আর জৈব সার ব্যবহার করি। ফলনও খারাপ না, বরং বাজারে দাম ভালো পাই।’
সাতক্ষীরা সদরের ওমরাপাড়ার মো. সোলাইমান মোড়ল, সাতক্ষীরা সদরের বালিথা এলাকার হেলাল উদ্দীন, সাতক্ষীরার কালিগঞ্জের কৃষ্ণনগরের বানিয়াপাড়ার সিরাজুল ইসলামসহ কয়েকশ আম বাগানি এবার গ্যাপ পদ্ধতি অনুসরণ করে আম উৎপাদন করে ভালো ফলন পেয়েছেন। তাদের আম অন্যদের চেয়ে চাহিদা বেশি হওয়ায় দামও বেশি। এ এলাকার কৃষকের উৎপাদিত আম রপ্তানির পাশাপাশি রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে কৃষকের বাজারে বিক্রি হয়েছে।
পার্টনার প্রকল্পের উপকর্মসূচি পরিচালক ড. মাহবুবা মুনমুন বলেন, উত্তম কৃষি চর্চা মানে শুধু ফসল ফলানো নয়, বরং উৎপাদন থেকে সংরক্ষণ ও পরিবহন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে মান ও নিরাপত্তা বজায় রাখা। এতে মাটি, পানি, রাসায়নিক, শ্রমিকের স্বাস্থ্য– সবকিছুর ভারসাম্য রক্ষা হয়।
প্রকল্পের কর্মসূচি সমন্বয়ক আবুল কালাম আজাদ বলেন, একটি ফসল গ্যাপ সার্টিফাইড হতে হলে কিছু নির্দিষ্ট পদ্ধতি মানতে হয়। আমরা কৃষককে সেই পদ্ধতি হাতে-কলমে শেখাচ্ছি। আগামীতে আমরা ১০ লাখ কৃষককে প্রশিক্ষণ দেব, যাতে তারা নিজেরা গ্যাপ সার্টিফাইড পণ্য উৎপাদন করতে পারেন।
বাংলাদেশ ফ্রুটস অ্যান্ড ভেজিটেবল এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের উপদেষ্টা ড. মনজুরুল ইসলাম বলেন, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্যসহ অনেক দেশেই এখন গ্যাপ মানের সনদ ছাড়া কৃষিপণ্য রপ্তানি করা যায় না। বাংলাদেশে গ্যাপভিত্তিক উৎপাদন বাড়লে আমাদের ফল ও সবজির রপ্তানি অনেকটাই বাড়বে। অনেক কৃষক অপ্রয়োজনীয় কীটনাশক ব্যবহার করেন। গ্যাপ পদ্ধতিতে এই অপব্যবহার কমবে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ছোট কৃষকের কাছে এই চর্চা পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় বাজারে পণ্যের দাম নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, অনেক সময় নিরাপদ পণ্য উৎপাদন করেও কৃষক ন্যায্যমূল্য পান না। এ ছাড়া সার্টিফিকেশন, প্রশিক্ষণ ও বাজার সংযোগের বিষয়গুলো সমন্বয় না হলে উদ্যোগটি টেকসই হবে না।
