Logo
×

Follow Us

মতামত

ছাদ কৃষি: ঢাকার ব্যস্ত নগরে পুষ্টির নতুন সম্ভাবনা

Icon

সাহিদুর রহমান

প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ২২:৫৫

ছাদ কৃষি: ঢাকার ব্যস্ত নগরে পুষ্টির নতুন সম্ভাবনা

সাহিদুর রহমান

ঢাকা ক্রমেই ঘন হয়ে উঠছে। কংক্রিটের দেয়াল বাড়ছে, কমছে খোলা জায়গা। এই শহরে নিরাপদ খাদ্য পাওয়া এখন অনেকের কাছে বিলাসিতা—বাজারের সবজি কিনতে গেলে ভরসার চেয়ে সন্দেহই বেশি কাজ করে। এই বাস্তবতায় ছাদ কৃষি আর শখের বিষয় নেই; এটি ধীরে ধীরে নগরজীবনের একটি প্রয়োজনীয় সমাধান হয়ে উঠছে।

ঢাকার হাজারো ভবনের ছাদ দিনের পর দিন অব্যবহৃত পড়ে থাকে। অথচ সামান্য উদ্যোগ নিলেই এই ফাঁকা জায়গা বদলে যেতে পারে ছোট্ট এক সবুজ খামারে। টব, ড্রাম, কিংবা পুরোনো বোতল—খুব সাধারণ উপকরণ দিয়েই চাষ করা সম্ভব নানা ধরনের শাকসবজি। লাল শাক, পালং, টমেটো, মরিচ বা বেগুন—সবই জন্মায় শহরের এই কংক্রিটের ওপরেই। অনেকেই এখন ছাদে লেবু, পেয়ারা বা ড্রাগন ফলের মতো ফলও ফলাচ্ছেন।

এখানে সবচেয়ে বড় শক্তি হলো নিয়ন্ত্রণ। নিজের হাতে উৎপাদিত ফসল মানেই কীটনাশক বা ক্ষতিকর রাসায়নিকের ঝুঁকি কম। পরিবারের শিশু বা বয়স্ক সদস্যদের জন্য এটি একটি নিরাপদ খাদ্য উৎস তৈরি করে। প্রতিদিনের রান্নায় নিজের ছাদের সবজি ব্যবহার করার মধ্যে যে স্বস্তি, সেটি বাজার থেকে কেনা কোনো পণ্যে পাওয়া যায় না।

অর্থনীতির দিক থেকেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। সবজির দাম যখন হঠাৎ বেড়ে যায়, তখন ছাদের বাগান একটি সুরক্ষা দেয়াল হিসেবে কাজ করে। নিয়মিত উৎপাদন হলে পরিবারের খরচ কমে, আর অতিরিক্ত উৎপাদন বিক্রি করেও আয় করা সম্ভব। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে এই ছোট পরিসরের উৎপাদনও বাজার খুঁজে পাচ্ছে।

তবে ছাদ কৃষির প্রভাব শুধু খাদ্য বা অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়। এটি শহরের পরিবেশেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনে। গাছপালা ছাদের তাপমাত্রা কমায়, বাতাসের মান কিছুটা উন্নত করে, আর সবচেয়ে বড় কথা—মানুষকে মানসিকভাবে স্বস্তি দেয়। দিনের শেষে নিজের গাছের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা, নতুন পাতা বা ফুল দেখা—এই ছোট ছোট অভিজ্ঞতাই নগরজীবনের চাপ কমাতে সাহায্য করে।

অবশ্য সবকিছু এত সহজও নয়। ছাদের ওজন বহন ক্ষমতা, পানি সরবরাহ, উপযুক্ত মাটি ও সার—এসব বিষয় গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হয়। অনেকেই শুরুতে ভুল করেন, ফলে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। কিন্তু প্রশিক্ষণ, পরিকল্পনা এবং সঠিক পরামর্শ থাকলে এসব বাধা কাটানো কঠিন নয়।

আসলে বিষয়টি বড় কোনো প্রকল্প নয়; বরং ছোট ছোট উদ্যোগের সমষ্টি। একটি ভবনের একটি ছাদ, তারপর আরেকটি—এভাবেই গড়ে উঠতে পারে একটি নগরজুড়ে সবুজ নেটওয়ার্ক। এতে একদিকে যেমন খাদ্য নিরাপত্তা বাড়বে, অন্যদিকে শহরের পরিবেশও কিছুটা হলেও শ্বাস নেওয়ার সুযোগ পাবে।

ঢাকার ভবিষ্যৎ শুধু নতুন সড়ক বা উঁচু ভবনে নয়, বরং এই ছোট ছোট সবুজ উদ্যোগেও নির্ভর করছে। এখন প্রশ্ন একটাই—আমরা কি আমাদের ছাদগুলোকে শুধু ফাঁকা জায়গা হিসেবে দেখব, নাকি সম্ভাবনার জমি হিসেবে ব্যবহার করব?

লেখক: কৃষিবিদ 

Logo