Logo
×

Follow Us

জাতীয়

প্রবল বর্ষণ, বন্যা ও পাহাড়ধসে বিপর্যস্ত পাঁচ জেলা; প্রাণহানি বেড়ে ৩৯, ক্ষতিগ্রস্ত ৯ লাখের বেশি মানুষ

সর্বশেষ সরকারি হিসাব বলছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে কক্সবাজারে, যেখানে ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে ১৩ জন রোহিঙ্গা। এছাড়া চট্টগ্রামে আটজন, বান্দরবানে ছয়জন এবং রাঙ্গামাটিতে দুজনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।

Icon

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬, ১৫:২৫

প্রবল বর্ষণ, বন্যা ও পাহাড়ধসে বিপর্যস্ত পাঁচ জেলা; প্রাণহানি বেড়ে ৩৯, ক্ষতিগ্রস্ত ৯ লাখের বেশি মানুষ

চট্টগ্রামের বন্যা পরিস্থিতি -ছবি, সংগ্রহ

টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল, নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি এবং পাহাড়ধসের কারণে চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচ জেলায় ভয়াবহ দুর্যোগ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দুর্যোগে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৩৯ জনে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে প্রায় লাখ ২৮ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ায় জনজীবন, যোগাযোগ, কৃষি শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ পরিস্থিতি প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, কক্সবাজারে সর্বোচ্চ ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ১৩ জন রোহিঙ্গা নাগরিক। এছাড়া চট্টগ্রামে আটজন, বান্দরবানে ছয়জন এবং রাঙ্গামাটিতে দুজন প্রাণ হারিয়েছেন।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের হিসাবে, অবিরাম বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ভূমিধসের প্রভাবে নগরীসহ জেলার ১৬টি উপজেলায় লাখ ৮৮ হাজার ৬৪৮টি পরিবার ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে। জেলার ১৭৬টি ইউনিয়ন পৌরসভা বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে। দুর্গতদের নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ৬৭৩টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু করা হয়েছে, যেখানে ২৩ হাজার ৮৫৩ জন আশ্রয় নিয়েছেন।

ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সহায়তায় সরকার ৭০০ টন চাল কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। এর মধ্যে ৩০০ টন চাল, কোটি ৩০ লাখ টাকা, ২২ হাজার ২৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার এবং ১৮ হাজার ৩৩০ প্যাকেট রান্না করা খাবার বিতরণ করা হয়েছে। অবশিষ্ট ৪০০ টন চাল কোটি ৭০ লাখ টাকা পরবর্তী ত্রাণ কার্যক্রমের জন্য সংরক্ষিত রয়েছে।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ১৫৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আগামী ১২ জুলাই পর্যন্ত ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত বহাল রাখা হয়েছে।

সাতকানিয়া বাঁশখালীতে সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি

চট্টগ্রামের সাতকানিয়া বাঁশখালী উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির সবচেয়ে বেশি অবনতি হয়েছে। দুই উপজেলায় পাঁচ লাখেরও বেশি মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। বাঁশখালীর বাহারছড়া ইউনিয়নে বন্যার পানিতে ভেসে আশিক (১১) মিরাজ () নামে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দুর্গম উপকূলীয় বহু এলাকায় এখনো ত্রাণ পৌঁছায়নি। দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকার পাশাপাশি মোবাইল নেটওয়ার্ক অচল থাকায় যোগাযোগ ক্ষয়ক্ষতির সঠিক তথ্য সংগ্রহে জটিলতা তৈরি হয়েছে।

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের সাতকানিয়া অংশ বৃহস্পতিবার থেকে পানির নিচে রয়েছে। বর্তমানে সীমিতভাবে যান চলাচল করলেও পানি আরও বাড়লে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সাঙ্গু ডলু নদীর পানি বৃদ্ধি এবং পাহাড়ি ঢলের কারণে বাজালিয়া, কেওচিয়া, ছদাহা, কালিয়াইশ, ধর্মপুর, খাগরিয়া, আমিলাইশ, ঢেমশা, নলুয়া, চরতি পুরানগড় ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বসতবাড়ি, কৃষিজমি, মাছের ঘের, বাজার গ্রামীণ সড়ক পানির নিচে চলে যাওয়ায় অনেক স্থানে নৌকাই একমাত্র যাতায়াতের মাধ্যম হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি বিশুদ্ধ পানি খাদ্যের সংকটও তীব্র হয়েছে।

ছদাহা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মোরশেদুর রহমান বলেন, তাঁর ইউনিয়নের অন্তত পাঁচটি ওয়ার্ড সম্পূর্ণ প্লাবিত হয়েছে। কোথাও কোমর, কোথাও গলাসমান পানি রয়েছে। প্রায় হাজার ৫০০ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া চাল বন্যার কারণে এখনো দুর্গতদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।

সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খন্দকার মাহমুদুল হাসান জানান, চার লাখের বেশি মানুষ এখনও পানিবন্দী। উপজেলার প্রায় অর্ধেক কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুর্গম এলাকায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় উদ্ধার ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, সেনাবাহিনী স্পিডবোটের মাধ্যমে দুর্গম এলাকায় ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

বাঁশখালী উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নই বন্যাকবলিত হয়েছে। জোয়ারের পানি প্রবেশ করায় খানখানাবাদ, কাথারিয়া, বাহারছড়া, গণ্ডামারা, শেখেরখীল, সরল, ছনুয়া গুণাগরী ইউনিয়নে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। হাজার হাজার কাঁচাঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং তিন দিন ধরে অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। নিরাপদ পানি, শিশুখাদ্য ওষুধের সংকটও বেড়েছে।

বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন জানান, উপজেলার প্রায় অর্ধেক এলাকা এখনো পানির নিচে এবং এক লাখের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। পর্যন্ত ৪৬ টন চাল, হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার এবং হাজার মানুষের জন্য রান্না করা খাবার বিতরণ করা হয়েছে। তবে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় কয়েকটি এলাকায় এখনো ত্রাণ পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।

কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি বান্দরবানে দুর্ভোগ

ফটিকছড়ি, রাউজান, হাটহাজারী, মিরসরাই আনোয়ারার নিম্নাঞ্চলেও বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। এতে ঘরবাড়ি, কৃষিজমি মাছের ঘেরে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

কক্সবাজার জেলায় প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। চকরিয়া মাতামুহুরী এলাকায় সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ১৮টি ইউনিয়ন একটি পৌরসভা প্লাবিত হওয়ায় প্রায় তিন লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। নলকূপ ডুবে যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে এবং বহু পরিবারের রান্নাঘর পানির নিচে চলে গেছে।

এদিকে রাঙ্গামাটির সাজেক উপত্যকায় আটকে পড়া ৪৬১ জন পর্যটককে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী উদ্ধার করেছে। পানিতে ডুবে যাওয়া সড়ক নৌকায় পার করে তাঁদের নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেওয়া হয়।

নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকির কারণে বান্দরবানের সব পর্যটনকেন্দ্র ১৫ জুলাই পর্যন্ত বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জেলা প্রশাসন।

আরও বৃষ্টির শঙ্কা

রিজিওনাল ইন্টিগ্রেটেড মাল্টি-হ্যাজার্ড আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম (রাইমস) বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের যৌথ সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, বঙ্গোপসাগরে সক্রিয় মৌসুমি বায়ু লঘুচাপের প্রভাবে ১২ জুলাই পর্যন্ত চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি খাগড়াছড়িতে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। পাঁচটি জেলাকেই পাহাড়ধসের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

হবিগঞ্জেও নতুন করে বন্যা

উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল টানা বৃষ্টিতে খোয়াই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে হবিগঞ্জ সদর, বাহুবল বানিয়াচং উপজেলার চারটি ইউনিয়নের প্রায় ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়েছেন। অনেক পরিবার গবাদিপশু প্রয়োজনীয় মালামাল নিয়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। শহরের কয়েকটি এলাকা গুরুত্বপূর্ণ সড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে।

ত্রাণ তৎপরতা জোরদারের নির্দেশ

বন্যাকবলিত এলাকায় উদ্ধার ত্রাণ কার্যক্রম আরও জোরদারের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী জানিয়েছেন, সরকার পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করছে এবং জেলা প্রশাসনের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় করছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান সাতকানিয়া বাঁশখালীর দুর্গত এলাকা পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করেন। একই সঙ্গে তিনি উদ্ধার, ত্রাণ পুনর্বাসন কার্যক্রম আরও গতিশীল করার আহ্বান জানান।

 

Logo