কৃষিবিদ শাহাদাত হোসেন বিপ্লবের সাক্ষাৎকার
কৃষককে বাঁচাতে হলে কৃষিকে লাভজনক ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৭ জুলাই ২০২৬, ২৩:২১
শাহাদাত হোসেন বিপ্লব
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সমর্থিত কৃষিবিদদের সংগঠন এগ্রিকালচারিস্টস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এ্যাব) সম্প্রতি একটি সেমিনারে কৃষি, কৃষক ও খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে বিভিন্ন প্রস্তাব তুলে ধরেছে। সংগঠনটির সদস্য সচিব কৃষিবিদ শাহাদাত হোসেন বিপ্লব কৃষি খাতের নানা বিষয় নিয়ে ফারমার্স ভয়েসের সঙ্গে কথা বলেছেন।
এগ্রিকালচারিস্টস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এ্যাব) কী উদ্দেশ্যে কাজ করে?
শাহাদাত হোসেন বিপ্লব: এগ্রিকালচারিস্টস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এ্যাব) মূলত কৃষিবিদদের একটি সংগঠন। আমাদের প্রধান লক্ষ্য হলো কৃষকদের সমস্যা, সম্ভাবনা ও চাহিদাগুলো সরকারের কাছে তুলে ধরা এবং কৃষিবান্ধব নীতি প্রণয়নে ভূমিকা রাখা। আমরা বিশ্বাস করি, কৃষকের উন্নয়ন ছাড়া দেশের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। সেই চিন্তা থেকেই সংগঠন হিসেবে আমরা শুধু নীতিগত বিষয়েই কাজ করি না, সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবেও বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করি। সম্প্রতি আমরা কৃষকদের মধ্যে বীজ, সার ও শীতবস্ত্র বিতরণ করেছি। এছাড়া রাজধানীর ৩০০ ফিট এলাকায় একটি সমাবেশের পর সেখানে ক্ষতিগ্রস্ত গাছপালার পরিচর্যা করেছি এবং নতুন করে চারা রোপণ করেছি। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। তাই পরিবেশ রক্ষা এখন শুধু একটি কর্মসূচি নয়, এটি জাতীয় প্রয়োজন। সরকার পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের যে লক্ষ্য ঘোষণা করেছে, আমরা সেই কর্মসূচির অংশীদার হতে চাই। এ্যাবের পক্ষ থেকে পাঁচ লাখ বৃক্ষরোপণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে সাভারে ছয় হাজার চারা রোপণ করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে গাজীপুর, মানিকগঞ্জ ও নরসিংদীতেও একই ধরনের কর্মসূচি পরিচালনা করা হবে। আমরা চাই কৃষিবিদ, শিক্ষার্থী, কৃষক এবং সাধারণ মানুষ সবাই এই কর্মসূচিতে সম্পৃক্ত হোক।
সরকারের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন?
শাহাদাত হোসেন বিপ্লব: আমার মনে হয়, বর্তমান সরকার খুব অল্প সময়ের মধ্যে বিভিন্ন খাতে কাজ শুরু করেছে। প্রতিটি পদক্ষেপে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। আমরা মনে করি, সরকারকে সফল করতে হলে শুধু সরকারের একার প্রচেষ্টা যথেষ্ট নয়; নাগরিক সমাজ, কৃষিবিদ, সাংবাদিক ও বিভিন্ন পেশাজীবীকেও সহযোগিতা করতে হবে। আমরাও চেষ্টা করছি কীভাবে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন উদ্যোগ বাস্তবায়নে সহযোগিতা করা যায় এবং দেশের অগ্রযাত্রায় ভূমিকা রাখা যায়।
আমরা সবাই জানি, সুস্থ দেহে সুস্থ মন বাস করে। বর্তমানে পার্শ্ববর্তী মিয়ানমার ও ভারতের বিভিন্ন মাদক আমাদের যুবসমাজকে ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এই পরিস্থিতি থেকে তরুণদের ফিরিয়ে আনতে হলে তাদের খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও ইতিবাচক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। সে লক্ষ্যেই প্রতিটি উপজেলায় স্টেডিয়াম নির্মাণ এবং জাতীয় পর্যায়ে ফুটবলসহ বিভিন্ন খেলাধুলার আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে এসব কর্মসূচি চলমান রয়েছে। আমি মনে করি, যুবসমাজকে সুস্থ ও উৎপাদনশীল জীবনে ফিরিয়ে আনতে এ ধরনের উদ্যোগ আরও বিস্তৃত হওয়া উচিত।
বর্তমান সরকারের কৃষি নিয়ে কার্যক্রমে আপনার মূল্যায়ন কেমন?
শাহাদাত হোসেন বিপ্লব: আমাদের এই উপমহাদেশে কৃষকদের অধিকার নিয়ে আন্দোলনের ইতিহাস অনেক পুরোনো। ১৯৩৬ সালের লখনৌ অধিবেশনে কংগ্রেস প্রথম কৃষকদের অধিকার নিয়ে আলোচনা শুরু করে। এরপর শেরেবাংলা এ. কে. ফজলুল হক কৃষক সম্মেলনের মাধ্যমে কৃষকদের দাবি সামনে নিয়ে আসেন। পরে তেবাগা আন্দোলন হয়, যেখানে কৃষক নেতারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এরপর কাগমারী সম্মেলনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনে কৃষকদের অধিকার প্রশ্নটি সামনে এসেছে। অর্থাৎ কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম নতুন কোনো বিষয় নয়; এটি দীর্ঘ ইতিহাসের অংশ। স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ, খরা ও বন্যার অভিজ্ঞতার পর কৃষি উন্নয়নে যাঁরা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছেন, তাঁদের মধ্যে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি স্বল্প সময়ে প্রায় ১ হাজার ৫০০টি খাল খনন করেন, যার মোট দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ২৬ হাজার কিলোমিটার। তাঁর ১৯ দফা কর্মসূচির অধিকাংশই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষি ও কৃষকদের উন্নয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। আমার মতে, কৃষিকে রাষ্ট্রের উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ছিল।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর নির্বাচনী ইশতেহার ও ৩১ দফা কর্মসূচির আলোকে কৃষকদের জন্য বেশ কিছু উদ্যোগ বাস্তবায়ন শুরু করেছেন। এর মধ্যে কৃষক কার্ড ও ফ্যামিলি কার্ড অন্যতম। ইতোমধ্যে প্রায় ১২ লাখ কৃষককে ৫০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে এবং এক লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ মওকুফের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমরা মনে করি, এসব উদ্যোগ কৃষকদের জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
কৃষক কার্ডকে কেন এত গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন?
শাহাদাত হোসেন বিপ্লব: আমার মতে, কৃষক কার্ড বাংলাদেশের কৃষিব্যবস্থায় একটি মাইলফলক হতে পারে। কারণ দীর্ঘদিন ধরে কৃষকদের জন্য বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থাকলেও সেগুলো অনেক সময় সঠিক ব্যক্তির কাছে পৌঁছায়নি। কৃষক কার্ডের মাধ্যমে কৃষকদের জন্য বিভিন্ন সরকারি সেবা, ভর্তুকি ও সহায়তা একটি সমন্বিত ব্যবস্থার আওতায় আনা সম্ভব হবে। আমরা চাই কৃষক যেন প্রকৃত অর্থে রাষ্ট্রের নীতির কেন্দ্রে আসে। কৃষক শুধু খাদ্য উৎপাদন করেন না, দেশের অর্থনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তার ভিত্তিও গড়ে তোলেন।
কৃষক কার্ড নিয়ে বর্তমান সরকার যেসব পরিকল্পনার কথা বলছে, সেগুলো কী?
শাহাদাত হোসেন বিপ্লব: আমরা চাই কৃষক কার্ডের মাধ্যমে কৃষকদের জন্য অন্তত ১০টি গুরুত্বপূর্ণ সেবা নিশ্চিত করা হোক। এর মধ্যে থাকবে ভর্তুকি মূল্যে সার, বীজ ও কীটনাশক সরবরাহ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ, কৃষি বীমা, বিভিন্ন প্রণোদনা এবং অন্যান্য সরকারি সেবা। আমাদের বিশ্বাস, একজন কৃষক যদি একটি পরিচয়ের মাধ্যমে সব ধরনের সরকারি সুবিধা পান, তাহলে হয়রানি কমবে এবং প্রকৃত কৃষকের কাছেই সহায়তা পৌঁছাবে।
কৃষকের গুরুত্ব নিয়ে আপনার ব্যক্তিগত উপলব্ধি কী?
শাহাদাত হোসেন বিপ্লব: কবি বলেছেন, 'সব সাধকের বড় সাধক আমার দেশের চাষা।' এই কথার মধ্যে কৃষকের প্রকৃত মর্যাদা ফুটে উঠেছে। কোভিড-১৯ মহামারির সময় যখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়েছিল, তখন আমাদের দেশের কৃষকরাই খাদ্য উৎপাদন অব্যাহত রেখে দেশের মানুষকে নিরাপদ রেখেছেন। আমার বিশ্বাস, দেশকে এগিয়ে নিতে হলে কৃষককে আগে বাঁচাতে হবে। একজন কৃষক যদি নিরাপদ থাকেন, ন্যায্যমূল্য পান এবং উৎপাদনে উৎসাহ পান, তাহলে দেশের খাদ্যনিরাপত্তাও নিশ্চিত হবে।
কৃষি উন্নয়নের সঙ্গে পরিবেশ ও রাষ্ট্র পরিচালনার সম্পর্ককে কীভাবে দেখেন?
শাহাদাত হোসেন বিপ্লব: বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে রয়েছে। তাই পরিবেশ সংরক্ষণকে কৃষি উন্নয়ন থেকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করে 'ওয়ান ট্রি, ওয়ান চাইল্ড' কর্মসূচি পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে আমি মনে করি। একই সঙ্গে সরকারের ব্যয় ব্যবস্থাপনায় সংযমের বিষয়টিও ইতিবাচক। আমার মতে, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকেই যদি মিতব্যয়িতা ও সুশাসনের চর্চা শুরু হয়, তাহলে সমাজেও তার ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।
দেশে বেকারত্বের বর্তমান পরিস্থিতিকে কীভাবে দেখছেন?
শাহাদাত হোসেন বিপ্লব: বর্তমানে দেশে বেকারত্ব একটি বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতি তিনজন স্নাতকের মধ্যে একজন বেকার। কর্মসংস্থানের পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকায় অনেক তরুণ নিরুৎসাহিত হয়ে বিদেশমুখী হচ্ছে। অথচ বাংলাদেশ এখন ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনমিতিক লভ্যাংশের সময় পার করছে। অর্থাৎ ১৫ থেকে ৬০ বছর বয়সী কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা এখন সবচেয়ে বেশি। এই বিশাল জনশক্তিকে যদি সঠিকভাবে কাজে লাগানো যায়, তাহলে দেশের অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব। কিন্তু কর্মসংস্থানের অভাবে আমরা সেই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারছি না।
এই পরিস্থিতিতে কৃষি কীভাবে কর্মসংস্থানের বড় ক্ষেত্র হতে পারে?
শাহাদাত হোসেন বিপ্লব: বাংলাদেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৪৫ শতাংশ এবং গ্রামীণ কর্মজীবী নারীদের ৬৩ শতাংশ কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাই কৃষিকে শুধু খাদ্য উৎপাদনের খাত হিসেবে নয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টির অন্যতম বড় ক্ষেত্র হিসেবে দেখতে হবে। আমার মতে, আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে যুবসমাজকে যুক্ত করতে পারলে কৃষি খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে। শুধু জমিতে চাষ করাই কৃষি নয়। উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ, বিপণন—সব মিলিয়ে কৃষি এখন একটি বড় শিল্পে পরিণত হতে পারে।
শিক্ষিত তরুণদের কৃষিতে আকৃষ্ট করতে কী ধরনের উদ্যোগ প্রয়োজন?
শাহাদাত হোসেন বিপ্লব: আমরা অনেক বছর ধরে প্রচলিত বা ট্র্যাডিশনাল প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছি। কিন্তু এতে প্রত্যাশিত ফল আসেনি। এখন সময় এসেছে উদ্যোক্তা তৈরির। আমরা চাই শিক্ষিত যুবকদের কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা হোক। এ জন্য বিনা মর্টগেজে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণের ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে। একজন তরুণ চাইলে গরু মোটাতাজাকরণ, মাছ চাষ, কোয়েল পালন, দুগ্ধ খামার, ফল ও সবজি উৎপাদন কিংবা কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে সফল উদ্যোক্তা হতে পারেন। তরুণদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি করতে হবে যে কৃষিও একটি সম্মানজনক ও লাভজনক পেশা হতে পারে।
এ্যাব এ ক্ষেত্রে কী ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছে?
শাহাদাত হোসেন বিপ্লব: আমরা কেআইবিতে একটি কৃষি উদ্যোক্তা সম্মেলনের আয়োজনের চেষ্টা করছি। সেখানে সফল উদ্যোক্তাদের অভিজ্ঞতা নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা হবে। আমরা চাই তরুণরা সফল মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতা শুনুক, তারা কীভাবে শুরু করেছেন, কী ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন এবং কীভাবে সফল হয়েছেন—এসব জানুক। আমার বিশ্বাস, একজন সফল উদ্যোক্তার গল্প অনেক সময় একটি দীর্ঘ প্রশিক্ষণের চেয়েও বেশি অনুপ্রেরণা দিতে পারে। সেই সম্মেলনে আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকেও আমন্ত্রণ জানাবো।
কৃষি খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর মধ্যে কোনটিকে আপনি বেশি গুরুত্ব দেন?
শাহাদাত হোসেন বিপ্লব: উৎপাদনের পাশাপাশি বাজারজাতকরণ এবং সংরক্ষণ এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা। আমাদের দেশে সঠিক পরিবহন ও সংরক্ষণব্যবস্থার অভাবে মাঠপর্যায়েই ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ কৃষিপণ্য নষ্ট হয়ে যায়। একজন কৃষক অনেক কষ্ট করে ফসল উৎপাদন করেন। কিন্তু সেই ফসল যদি বাজারে পৌঁছানোর আগেই নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে কৃষকের লাভের পরিবর্তে লোকসান হয়। তাই কোল্ড চেইন, আধুনিক গুদাম, উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা এবং কৃষিপণ্য সংরক্ষণের প্রযুক্তি বাড়ানো জরুরি। এ ছাড়া এখন আর শুধু কায়িক পরিশ্রমের ওপর নির্ভর করে কৃষিকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। শ্রমিক সংকটও বাড়ছে। তাই কৃষির যান্ত্রিকীকরণ অপরিহার্য। যন্ত্রের ব্যবহার বাড়লে উৎপাদন খরচ কমবে, সময় বাঁচবে এবং উৎপাদনও বাড়বে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
আওয়ামী লীগের আমলে কৃষি খাতের সার্বিক চিত্রকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন?
শাহাদাত হোসেন বিপ্লব: আমাদের মতে, গত ১৭ বছরে কৃষি খাতে নানা ধরনের সমস্যা তৈরি হয়েছে। আমরা মনে করি, কৃষি প্রবৃদ্ধির যে পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়েছে, তার অনেক ক্ষেত্রেই বাস্তবতার সঙ্গে অসঙ্গতি ছিল। কৃষি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৩৬ শতাংশ থেকে প্রায় ১ শতাংশের কাছাকাছি নেমে এসেছে। একই সময়ে খাদ্য উৎপাদনের হারও জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়েনি। এটি ভবিষ্যতের খাদ্যনিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক বলে আমি মনে করি। ২০১৮ সালে স্বাধীনতার পর সর্বোচ্চ প্রায় ৯০ লাখ মেট্রিক টন খাদ্য আমদানি করতে হয়েছিল। একটি কৃষিনির্ভর দেশের জন্য এটি সুখকর চিত্র নয়। কৃষকদের জন্য বিভিন্ন সময়ে প্রণোদনার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আমাদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রেই প্রকৃত কৃষকের পরিবর্তে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা সেই সুবিধা নিয়েছেন। ফলে যাদের জন্য এই সহায়তা ছিল, তারা বঞ্চিত হয়েছেন। আমরা চাই ভবিষ্যতে কৃষকের নামে যে সুবিধা দেওয়া হবে, তা যেন শতভাগ প্রকৃত কৃষকের কাছেই পৌঁছায়। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত দেশের কৃষিকে আরও শক্তিশালী করে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা ধরে রাখা।
কৃষকদের দুর্ভোগের উদাহরণ হিসেবে আপনি কী দেখছেন?
শাহাদাত হোসেন বিপ্লব: বিভিন্ন সময়ে ন্যায্যমূল্য না পাওয়া, সেচের পানির সংকট এবং উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় কৃষক মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জামালপুর, শেরপুর, রাজশাহী ও টাঙ্গাইলের বিভিন্ন এলাকায় কৃষকদের আত্মহত্যা কিংবা ক্ষোভে ধানের ক্ষেতে আগুন দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। এগুলো শুধু বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, কৃষকের দীর্ঘদিনের হতাশার বহিঃপ্রকাশ বলেই আমি মনে করি। বিএডিসির মাধ্যমে অনেক সময় নিম্নমানের বীজ সরবরাহ করা হয়েছে। একজন কৃষক যদি শুরুতেই মানসম্মত বীজ না পান, তাহলে তিনি কখনোই ভালো উৎপাদন পাবেন না। তাই কৃষি উন্নয়নের প্রথম শর্তই হচ্ছে মানসম্মত বীজ নিশ্চিত করা। কৃষকের সঙ্গে যেন কোনো ধরনের প্রতারণা না হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
বর্তমান ব্যবস্থার প্রধান সমস্যাগুলো কী বলে মনে করেন?
শাহাদাত হোসেন বিপ্লব: কৃষি মন্ত্রণালয় এবং এর অধীন বিভিন্ন দপ্তরে এখনো অনেক সমস্যা রয়েছে বলে আমরা মনে করি। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। একজন কৃষককে একটি সেবা পেতে অনেক সময় একাধিক দপ্তরে যেতে হয়। এতে সময় যেমন নষ্ট হয়, তেমনি ভোগান্তিও বাড়ে। আমার মতে, কৃষি খাতে কার্যকর সেবা নিশ্চিত করতে হলে প্রথমেই জবাবদিহি বাড়াতে হবে। দুর্নীতিগ্রস্ত ও অদক্ষ কর্মকর্তাদের পরিবর্তে যোগ্য, দক্ষ ও মেধাবী কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দিতে হবে। কৃষি একটি উৎপাদনমুখী খাত। এখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে কৃষকের ওপর।
নীতিনির্ধারণে কী ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন বলে মনে করেন?
শাহাদাত হোসেন বিপ্লব: আমাদের দেশে অনেক সময় ওপর থেকে সিদ্ধান্ত নিয়ে তা মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু আমি মনে করি, কৃষিতে এ ধরনের পদ্ধতি সব সময় কার্যকর হয় না। কৃষকদের সমস্যার সবচেয়ে ভালো জানেন কৃষকরাই। তাই 'টপ টু বটম' নয়, বরং ‘বটম টু টপ’ পদ্ধতিতে নীতিনির্ধারণ হওয়া উচিত। মাঠপর্যায়ের কৃষক, কৃষি কর্মকর্তা, গবেষক ও কৃষিবিদদের মতামতের ভিত্তিতে পরিকল্পনা করা হলে সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবসম্মত হবে এবং বাস্তবায়নও সহজ হবে।
কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে কী করা উচিত?
শাহাদাত হোসেন বিপ্লব: আমাদের প্রস্তাব হলো, ইউনিয়ন পর্যায়ে শস্য ক্রয়কেন্দ্র গড়ে তোলা। বর্তমানে অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে কম দামে ফসল বিক্রি করেন। যদি ইউনিয়ন পর্যায়েই সরকারি ক্রয়কেন্দ্র থাকে, তাহলে কৃষক সরাসরি সরকার বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছে ন্যায্যমূল্যে ফসল বিক্রি করতে পারবেন। এতে কৃষক যেমন লাভবান হবেন, তেমনি বাজার ব্যবস্থাও আরও স্বচ্ছ হবে।
ডিজিটাল প্রযুক্তি কৃষিতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
শাহাদাত হোসেন বিপ্লব: বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তি ছাড়া কৃষির উন্নয়ন সম্ভব নয়। আমরা চাই মাঠপর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তাদের ল্যাপটপ ও স্মার্টফোন দেওয়া হোক, যাতে তাঁরা দ্রুত কৃষকদের কাছে তথ্য ও সেবা পৌঁছে দিতে পারেন। ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে রোগবালাই শনাক্তকরণ, আবহাওয়ার তথ্য, বাজারদর, কৃষি পরামর্শ ও বিভিন্ন সরকারি সেবা আরও সহজে কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।
ভবিষ্যতের কৃষি নিয়ে আপনার ভাবনা কী?
শাহাদাত হোসেন বিপ্লব: আমাদের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হওয়া উচিত কৃষিকে শুধু খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার পেশা হিসেবে না দেখে একটি লাভজনক বাণিজ্যিক খাতে পরিণত করা। কৃষক যাতে উৎপাদন করে ভালো আয় করতে পারেন, সেই পরিবেশ তৈরি করতে হবে। বাংলাদেশের কৃষিকে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হলে উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ, বিপণন—সব ক্ষেত্রেই আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। কৃষিকে একটি পূর্ণাঙ্গ কৃষি-শিল্পে রূপান্তর করতে হবে।
সবশেষে কৃষি ও কৃষকদের নিয়ে আপনার বার্তা কী?
শাহাদাত হোসেন বিপ্লব: বাংলাদেশের অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা এবং গ্রামীণ জীবনের ভিত্তি হচ্ছে কৃষি। কৃষককে বাদ দিয়ে দেশের উন্নয়নের কথা কল্পনাও করা যায় না। আমরা চাই কৃষি এমন একটি খাতে পরিণত হোক, যেখানে একজন তরুণ গর্বের সঙ্গে উদ্যোক্তা হতে পারবেন, কৃষক তাঁর উৎপাদনের ন্যায্যমূল্য পাবেন, প্রযুক্তি সহজলভ্য হবে এবং সরকারি সেবা কোনো ধরনের হয়রানি ছাড়াই মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাবে। দীর্ঘমেয়াদি কৃষিনীতি, সুশাসন, যান্ত্রিকীকরণ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কৃষকবান্ধব নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে কৃষিতে আরও শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাওয়া সম্ভব বলে আমি বিশ্বাস করি। কৃষককে বাঁচাতে পারলে দেশও এগিয়ে যাবে। সেটিই হওয়া উচিত আমাদের সবার অঙ্গীকার।
