Logo
×

Follow Us

সাক্ষাৎকার

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিমের সাক্ষাৎকার

কৃষকের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছানোই আমাদের প্রধান লক্ষ্য

Icon

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬, ২২:০০

কৃষকের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছানোই আমাদের প্রধান লক্ষ্য

মো. আব্দুর রহিম

দেশের কৃষি উৎপাদন ধরে রাখা, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা, কৃষকদের কাছে দ্রুত সেবা পৌঁছে দেওয়া এবং প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সরকারি সংস্থা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই)। চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন মো. আব্দুর রহিম। দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, কৃষক কার্ড কর্মসূচি বাস্তবায়ন, দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে কৃষি ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার নানা উদ্যোগ নিয়েছেন বলে জানান তিনি। বুধবার এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব বিষয় নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর কোন বিষয়কে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিয়েছেন?

মো. আব্দুর রহিম: আমি চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করি। দায়িত্ব নেওয়ার পর আমার প্রথম উপলব্ধি ছিল, মাঠ প্রশাসন থেকে শুরু করে অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয় পর্যন্ত পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও সুশৃঙ্খল করা প্রয়োজন। তবে সব কিছুর আগে আমি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার বিষয়ে।

এ লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই ২০টি নির্দেশনা সম্বলিত একটি অফিস আদেশ জারি করি। এর মাধ্যমে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা থেকে শুরু করে প্রধান কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।

বিশেষ করে মাঠের কাজে প্রথম সারিতে থাকা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তাঁরা যেন নিয়মিত পাক্ষিক মাঠ পরিদর্শনের সূচি অনুসরণ করেন এবং কৃষকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বজায় রাখেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে কী কী পদক্ষেপ নিয়েছেন?

মো. আব্দুর রহিম: উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কার্যক্রম মনিটরিং আরও জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি কৃষি উপকরণ, বিশেষ করে বীজ, সার ও ডিজেল বিতরণে আর্থিক বিধিবিধান কঠোরভাবে অনুসরণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আমি সব সময় কর্মকর্তাদের বলি, কৃষক দেশের প্রাণ। তাই তাঁদের সঙ্গে ইতিবাচক আচরণ করতে হবে। কৃষকের কোনো সমস্যার কথা শুনে সরাসরি 'না' না বলে কীভাবে সমাধান করা যায়, সেই মনোভাব থাকতে হবে।

এ ছাড়া মাঠপর্যায়ে সার, কীটনাশক ও সেচ ব্যবস্থাপনার ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। অফিসের পরিবেশ উন্নত করতে ইনডোর প্ল্যান্ট ও বাগান করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রধান কার্যালয়ে কর্মকর্তাদের অভ্যন্তরীণ বিভেদ দূর করে সবাইকে একটি পরিবারের সদস্য হিসেবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছি। দুর্নীতি ও অনিয়মের বিষয়ে আমাদের অবস্থান একেবারেই স্পষ্ট। এখানে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। প্রয়োজন হলে শাস্তিমূলক বদলিসহ প্রশাসনিক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।

দায়িত্ব নেওয়ার পর আপনার নেতৃত্বে আর কী কী পরিবর্তন এসেছে?

মো. আব্দুর রহিম: আমি ব্যক্তিগতভাবে ৩১ বছরের চাকরি জীবনে সততা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করার চেষ্টা করেছি। এখনো কৃষকদের প্রয়োজনে আমার মোবাইল ফোন ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকে। অধিদপ্তরের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় আরও শৃঙ্খলা আনতে বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে কর্মকর্তাদের সরকারি ই-জিপি ব্যবস্থায় দক্ষ করে তুলতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যাতে সরকারি ক্রয় কার্যক্রম আরও স্বচ্ছ ও দ্রুত সম্পন্ন করা যায়। এ ছাড়া কৃষি উন্নয়নের জন্য ২৯টি নতুন উন্নয়ন প্রকল্প জমা দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন উইংয়ের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে প্রতি দুই মাস অন্তর সমন্বয় সভা করা হচ্ছে।

সরকার কৃষক কার্ড কর্মসূচি চালু করছে। এর বর্তমান প্রস্তুতি কেমন?

মো. আব্দুর রহিম: কৃষক কার্ড বর্তমানে সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচি। এর পাইলট কার্যক্রম সফলভাবে শেষ হয়েছে। এখন দেশের ৫০৩টি ব্লকে কৃষকদের তথ্য সংগ্রহ চলছে। এ কর্মসূচি সরাসরি কৃষি মন্ত্রণালয় এবং প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে মনিটরিং করা হচ্ছে। দেশের ৫ হাজার ৫০০ উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা কোবো টুলস ব্যবহারের প্রশিক্ষণ নিয়ে মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করছেন। মাত্র চার দিনেই প্রায় সাড়ে ৪ লাখ কৃষকের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এই কার্ড চালু হলে কৃষকেরা সরকারি প্রণোদনা, কৃষি ঋণ, বিভিন্ন সহায়তা কর্মসূচি এবং উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার সুবিধা পাবেন।

দেশব্যাপী বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির অগ্রগতি কী?

মো. আব্দুর রহিম: আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর জাতীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চলতি বছর ২৫ লাখ গাছ লাগানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এরই মধ্যে ১৯ লাখের বেশি গাছ রোপণ করা হয়েছে। প্রতিটি গাছ জিও-ট্যাগিংয়ের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। যাতে শুধু রোপণ নয়, গাছের টিকে থাকাও নিশ্চিত করা যায়।

সাম্প্রতিক দুর্যোগের পর ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে?

মো. আব্দুর রহিম: সাম্প্রতিক অতিবৃষ্টি ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সাতটি জেলা—রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে কৃষি পুনর্বাসন কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য ৩২০ মেট্রিক টন উন্নত জাতের ধানবীজ সরবরাহ করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে বিআর২২, বিআর২৩, বিনাশাইল ও নাজিরশাইল। সরকারি জমিতে বীজতলা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে কৃষকেরা দ্রুত চারা পেতে পারেন। পাশাপাশি বিনা মূল্যে গাছের চারা, জৈব সার ও প্রয়োজনীয় খুঁটি সরবরাহ করা হচ্ছে।

এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রস্তুতি কী?

মো. আব্দুর রহিম: জলবায়ু পরিবর্তন এখন কৃষির সবচেয়ে বড় বাস্তবতা। এ কারণে আমরা অঞ্চলভিত্তিক উপযোগী প্রযুক্তি ও জাত সম্প্রসারণে গুরুত্ব দিচ্ছি। হাওর অঞ্চলের জন্য আগাম ও ঠান্ডা সহনশীল ব্রিধান-১১৮ সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি বন্যা ও লবণাক্ততা সহনশীল ধানের জাত কৃষকদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতের কৃষিকে আরও টেকসই করতে সোলার সেচব্যবস্থা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থাপনা এবং এগ্রো-প্রসেসিং জোন গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী বলে মনে করেন?

মো. আব্দুর রহিম: আমাদের সামনে সবচেয়ে বড় প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ হলো ফসল কাটার পরের ক্ষতি (পোস্ট-হারভেস্ট লস) কমানো এবং কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা। রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমিয়ে জৈব সারের ব্যবহার বাড়ানোও বড় চ্যালেঞ্জ। এ জন্য ইতোমধ্যে আমরা বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছি। বিশেষ করে কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ও ফসলের ক্ষতি কমাতে মিনি কোল্ডস্টোরেজ বিতরণ করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি প্রশাসনিক দিক থেকে কর্মকর্তাদের নৈতিক মান আরও উন্নত করা এবং সবাইকে এই প্রতিষ্ঠানকে নিজের প্রতিষ্ঠান হিসেবে মনে করে দায়িত্ব পালনে উদ্বুদ্ধ করাও বড় চ্যালেঞ্জ। আমার বিশ্বাস, সৎ নেতৃত্ব, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং মাঠপর্যায়ে কৃষকদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ বজায় রাখতে পারলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর দেশের কৃষিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিতে সক্ষম হবে।

Logo