সাক্ষাৎকার: মোহাম্মদ আরিফুর রহমান
আধুনিক প্রযুক্তিতে বাড়ছে আমের ফলন ও মান
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ২৩:৫১
মোহাম্মদ আরিফুর রহমান
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ আরিফুর রহমান। তিনি প্রকল্পের অধীনে দীর্ঘদিন রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন, বাজারজাত, প্রক্রিয়াজাত, উদ্যোক্তা তৈরিসহ আম উৎপাদন বাড়ানো এবং চাষিদের সমস্যা নিয়ে কাজ করছেন। দেশের আম খাতের বর্তমান অবস্থা, সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে কথা বলেছেন মোহাম্মদ আরিফুর রহমান।
এবার আম উৎপাদন কেমন হবে?
মোহাম্মদ আরিফুর রহমান: বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ২ লাখ হেক্টর জমিতে আমের চাষ হয়। গত বছর মোট উৎপাদন হয়েছে প্রায় ২৬ লাখ মেট্রিক টন, যা আমাদের বিশ্বে শীর্ষ উৎপাদনকারী দেশগুলোর কাতারে রাখে। এবার আমাদের লক্ষ্য সেই উৎপাদনকে অতিক্রম করা। সাধারণভাবে কৃষিতে একটি ধারাবাহিকতা থাকে—গত বছরের উৎপাদনকে ভিত্তি ধরে পরবর্তী বছরের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। সে হিসেবে এবারও আমরা উৎপাদন বাড়ার আশা করছি। আমের ক্ষেত্রে একটি প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে—যাকে বলা হয় ‘অন ইয়ার’ ও ‘অফ ইয়ার’। এবার আমের ‘অন ইয়ার’, মুকুল বেশি ফলনও বেশি হবে। যে বছর গাছে বেশি মুকুল আসে, ফলন বেশি হয়, পরের বছর স্বাভাবিকভাবেই সেই গাছ কিছুটা বিশ্রামে যায় এবং উৎপাদন কমে। এটি মূলত গাছের ফিজিওলজিক্যাল আচরণ। আগে এই ওঠানামা বেশি দেখা যেত। এখন আধুনিক প্রযুক্তি, সঠিক পরিচর্যা এবং বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপনার কারণে এই পার্থক্য অনেকটাই কমে এসেছে। কৃষকেরা এখন ছাঁটাই, সুষম সার প্রয়োগসহ বিভিন্ন আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করছেন, ফলে মোট উৎপাদন তুলনামূলক স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হচ্ছে।
রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্প—এর লক্ষ্য ও কার্যক্রম কী?
মোহাম্মদ আরিফুর রহমান: এই প্রকল্পটি শুরু হয়েছে ২০২২ সালের জুলাই মাসে। মূল লক্ষ্য একটাই—বাংলাদেশের আমকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার উপযোগী করে তোলা। একসময় আমাদের দেশের আমের সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল গুণগত মান। ফলের গায়ে দাগ থাকত, রোগাক্রান্ত হতো, আকার-আকৃতিতে একরকম থাকত না। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে গ্রহণযোগ্যতা কম ছিল। এই বাস্তবতা বদলাতে আমরা কয়েকটি স্তরে কাজ করছি।
প্রথমত, মাঠপর্যায়ে কৃষকদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। প্রদর্শনী প্লটের মাধ্যমে দেখানো হচ্ছে কীভাবে উন্নত জাত নির্বাচন, সঠিক ছাঁটাই, রোগবালাই দমন এবং ফলের মান উন্নত করা যায়।
দ্বিতীয়ত, উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের আধুনিক প্রযুক্তিতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, যাতে তারা মাঠে কৃষকদের কার্যকরভাবে সহায়তা করতে পারেন।
তৃতীয়ত, আমরা শুধু উৎপাদনেই থেমে নেই—পুরো এক্সপোর্ট চেইন নিয়ে কাজ করছি। উৎপাদনকারী, সংগ্রাহক, রপ্তানিকারক, প্যাকেজিং ও পরিবহন সংশ্লিষ্ট সবাইকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। কারণ একটি আম বাগান থেকে বিদেশি বাজার পর্যন্ত পৌঁছাতে প্রতিটি ধাপ গুরুত্বপূর্ণ। লোডিং-আনলোডিংয়ের সময় যাতে ফল ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেই বিষয়েও জোর দেওয়া হচ্ছে। এতে পোস্ট-হারভেস্ট লস কমছে, যা সরাসরি কৃষকের লাভের সঙ্গে সম্পর্কিত।
এই উদ্যোগে কী ধরনের পরিবর্তন এসেছে?
মোহাম্মদ আরিফুর রহমান: পরিবর্তন চোখে পড়ার মতো। এখন বাজারে গুণগত মানসম্পন্ন আমের প্রাপ্যতা অনেক বেড়েছে। একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো—আমের মৌসুম দীর্ঘ হয়েছে। আগে মৌসুম সীমাবদ্ধ ছিল কয়েক মাসে। এখন মে মাসের মাঝামাঝি থেকে শুরু হয়ে অক্টোবর পর্যন্ত বাজারে আম পাওয়া যাচ্ছে। এর বাইরে অফ-সিজনেও উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। ‘কাটিমন’ এবং ‘বারী আম-১১’ জাতের কারণে ডিসেম্বর-জানুয়ারিতেও আম পাওয়া যাচ্ছে। ফলে প্রায় সারা বছরই বাজারে আমের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে। রপ্তানির ক্ষেত্রেও বড় অগ্রগতি হয়েছে। ২০১৫-১৬ সালে যেখানে ২০০-২৫০ মেট্রিক টন আম রপ্তানি হতো, সেখানে এখন তা কয়েকগুণ বেড়েছে। এক পর্যায়ে ৩ হাজার ১০০ মেট্রিক টন পর্যন্ত পৌঁছেছিল। গত বছর রপ্তানি হয়েছে ২ হাজার ১৯৪ মেট্রিক টন। বর্তমানে বাংলাদেশ ৩৮টি দেশে আম রপ্তানি করেছে। নতুন করে চীন, মালয়েশিয়া, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া বাজার আগ্রহ দেখাচ্ছে। এই খাত ঘিরে নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও তৈরি হয়েছে। অনলাইনে আম বিক্রি বাড়ছে, শিক্ষিত তরুণেরা উদ্যোক্তা হচ্ছেন। পাশাপাশি ক্যারেট, র্যা পিং পেপার, কুরিয়ার সার্ভিস—এসব সহায়ক খাতও বিস্তৃত হচ্ছে।
দেশে আমের মৌসুমে বিভিন্ন দোকানে লিখে রাখা হচ্ছে—ফরমালিনমুক্ত আম। অনলাইনেও ফরমালিনমুক্ত দাবি করে বিভিন্ন জন আম বিক্রি করছেন। এই প্রচারণায় ক্রেতারা কতটুকু আস্থা রাখতে পারেন?
মোহাম্মদ আরিফুর রহমান : এখানে একটি বড় ভুল ধারণা আছে। বাস্তবতা হলো—আমে ফরমালিন ব্যবহার করা হয় না। ফরমালিন মূলত প্রাণিজ আমিষ সংরক্ষণে ব্যবহৃত হয়। ফলের ক্ষেত্রে এর ব্যবহার বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত নয়। আমে প্রাকৃতিকভাবেই ‘ফরমালডিহাইড’ থাকে, যা ফল পাকতে সহায়তা করে। অনেক সময় পরীক্ষায় এটি ধরা পড়লে মানুষ ভুল বোঝেন। আমরা কৃষকদের নির্দিষ্ট নিয়মে কীটনাশক ও গ্রোথ রেগুলেটর ব্যবহারের পরামর্শ দিই। সাধারণত ১৫ দিন পর এসব রাসায়নিকের কোনো অবশিষ্টাংশ থাকে না। তাই হারভেস্টের অন্তত ১৫-২০ দিন আগে স্প্রে বন্ধ রাখতে বলা হয়। এছাড়া ‘ফ্রুট ব্যাগিং’ পদ্ধতি ব্যবহার করলে নিরাপদ আম উৎপাদন নিশ্চিত করা যায়। তাই ‘ফরমালিনমুক্ত’ লেখা অনেক ক্ষেত্রেই বিপণন কৌশল—বাস্তবতার সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক নেই।
রপ্তানির সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো কী?
মোহাম্মদ আরিফুর রহমান: বাংলাদেশের আম রপ্তানির সম্ভাবনা যথেষ্ট উজ্জ্বল। তবে কিছু কাঠামোগত সমস্যা এখনো রয়ে গেছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ব্যাকওয়ার্ড ও ফরওয়ার্ড লিংকেজ। অর্থাৎ উৎপাদন থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ, পরিবহন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছানো—এই পুরো শৃঙ্খলে কিছু দুর্বলতা আছে। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে যুদ্ধ বা রাজনৈতিক অস্থিরতায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জেট ফুয়েলের দাম বাড়লে বিমান পরিবহন খরচ বেড়ে যায়, যা রপ্তানিকে ব্যয়বহুল করে তোলে। তবে সরকার এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কাজ করছে। উৎপাদন বাড়িয়ে ইউনিট খরচ কমানো, নতুন বাজার খোঁজা এবং আধুনিক সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে।
দেশের শীর্ষ আম উৎপাদন অঞ্চল কোনটি?
মোহাম্মদ আরিফুর রহমান: একসময় রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ ছিল আম উৎপাদনের কেন্দ্র। এখন সেই চিত্র বদলেছে। নওগাঁ জেলার সাপাহার ও পোরশা এলাকায় ব্যাপকভাবে বাণিজ্যিক বাগান গড়ে উঠেছে। সেখানে ‘আল্ট্রা হাই ডেনসিটি’ পদ্ধতিতে চাষ হচ্ছে—অল্প জায়গায় বেশি গাছ লাগিয়ে উৎপাদন বাড়ানো হচ্ছে। বর্তমানে নওগাঁই দেশের শীর্ষ আম উৎপাদনকারী জেলা হিসেবে উঠে এসেছে। জাতের দিক থেকে ‘আম্রপালি’ সবচেয়ে বেশি বিস্তার লাভ করেছে। এর মৌসুম দীর্ঘ, ফলন ভালো এবং বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক। বর্তমানে রপ্তানির প্রায় ৮০ শতাংশই এই জাতের আম।
কিন্তু প্রতি বছর আম উৎপাদনে রেকর্ড গড়লেও চাষি দাম পান না। সমাধান কোথায়?
মোহাম্মদ আরিফুর রহমান: এই সমস্যার মূল কারণ খুব স্পষ্ট—একই সময়ে বিপুল পরিমাণ আম বাজারে চলে আসে। ফলে সরবরাহ বেড়ে গিয়ে দাম পড়ে যায়। এই চাপ কমাতে আমরা প্রক্রিয়াজাত শিল্পে জোর দিচ্ছি। আমের পাল্প, জুস, পাউডার, শুকনা আম—এসব পণ্য তৈরি করলে অতিরিক্ত উৎপাদন সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে আমরা সারা বছর উৎপাদনের দিকে জোর দিচ্ছি। ‘কাটিমন’, ‘বারী আম-১১’, ‘গৌড়মতি’—এসব জাত বিভিন্ন সময়ে ফল দেয়। এতে বাজারে একসাথে চাপ পড়ে না, দামও তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকে।
