সাক্ষাৎকার: অধ্যাপক ড. এম এ রহিম
৮০ শতাংশ মানুষ কৃষিনির্ভর, তবুও কৃষককে কেউ দাম দেয় না
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ২৩:০২
অধ্যাপক ড. এম এ রহিম
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক কৃষিবিজ্ঞানী ড. এম এ রহিমকে ‘স্বাধীনতা পুরস্কার ২০২৬’ প্রদান করা হয়েছে। কৃষি গবেষণা ও প্রশিক্ষণে অসামান্য অবদানের জন্য দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক এই সম্মাননা পেয়েছেন তিনি। গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে তাঁর হাতে পুরস্কার তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে কৃষি গবেষণা, শিক্ষা ও প্রযুক্তি বিস্তারে কাজ করে যাওয়া এই বিজ্ঞানী অবসর নেওয়ার পরও কৃষি উন্নয়ন ও উদ্যোক্তা তৈরির কাজে সক্রিয় রয়েছেন। পুরস্কারপ্রাপ্তির পর তাঁর সঙ্গে সমসাময়িক কৃষি, নীতি, সংকট ও সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেছেন।
স্বাধীনতা পুরস্কার পাওয়ার অনুভূতি কেমন?
অধ্যাপক এম এ রহিম: রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি অবশ্যই আনন্দের। তবে আমি এটাকে ব্যক্তিগত অর্জন হিসেবে দেখি না। এটা দেশের কৃষক, কৃষিবিদ, গবেষক—সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার স্বীকৃতি। আমাদের দেশে খাদ্যের ঘাটতি অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা গেছে, কিন্তু পুষ্টির ঘাটতি এখনো বড় সমস্যা। এই জায়গায় ফলমূল ও সবজির উৎপাদন বাড়ানো খুব জরুরি। বিশেষ করে দেশি ফলের উৎপাদন বাড়াতে পারলে তা সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য হবে। আমি আমার কাজের মাধ্যমে সেই লক্ষ্যেই এগিয়ে যেতে চেয়েছি। এখনও সেই কাজ করছি।
দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় বাংলাদেশের কৃষিকে কোথায় দেখছেন?
অধ্যাপক এম এ রহিম: কৃষি আমাদের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। কিন্তু নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সেই গুরুত্ব সবসময় প্রতিফলিত হয় না। আমাদের দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ত সরাসরি বা পরোক্ষভাবে। কিন্তু আমরা কৃষকদের দাম দিই না, তাদের অবহেলা করি। অন্যদিকে বাস্তবতা হলো—গার্মেন্টস ও প্রবাসী আয়ের পর কৃষিই সবচেয়ে বড় অবদান রাখছে। খাদ্যশস্যের পাশাপাশি মৎস্য, পশুপালন—সব মিলিয়ে যদি সমন্বিতভাবে এগোনো যায়, তাহলে কৃষি খাত জাতীয় প্রবৃদ্ধির তৃতীয় প্রধান শক্তি হয়ে উঠতে পারে। সম্ভাবনা আছে, কিন্তু সেই অনুযায়ী পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ দরকার।
কৃষিতে নীতি ও বাজেট নিয়ে আপনার প্রধান উদ্বেগ কী?
অধ্যাপক এম এ রহিম: এখানে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, দৃষ্টিভঙ্গির ঘাটতি। ১৯৭৫-৭৬ সালে কৃষিতে বাজেট বরাদ্দ ছিল ৩ শতাংশের বেশি, এখন তা কমে প্রায় ১ শতাংশে নেমে এসেছে। অথচ দেশের অর্থনীতিতে কৃষির অবদান কমেনি। আরেকটি বড় সমস্যা হচ্ছে প্রণোদনা ও প্রকল্পের বাস্তবায়ন। অনেক সময় প্রণোদনার টাকা কৃষকের কাছে পৌঁছায় না। আমি একটা দেশি প্রজেক্টে দেখেছি, যারা এগ্রিকালচারে ইনভেস্ট করেছে। তাদের জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘হাউ মাচ ইজ ডাইরেক্টলি অর্থাৎ কৃষক কতটুকু পায়?’ উনি পলিসি লেভেলে খুব উচ্চ উচ্চ পদে আছে। তিনি বললেন, ‘২% ম্যাক্সিমাম ২%’। বাকিটা বেতন, প্রশাসনিক খরচ, পরামর্শক ফি ইত্যাদিতে চলে যায়। ফলে প্রকল্প নেওয়া হলেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না। টেকসই উন্নয়নের জন্য কৃষিকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। কৃষি শুধু খাদ্য উৎপাদনের খাত নয়, এটি দেশের অর্থনীতি, পুষ্টি নিরাপত্তা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার মূল ভিত্তি। কৃষকের প্রতি সম্মান, ন্যায্যতা এবং কার্যকর নীতিনির্ধারণ ছাড়া এই খাতের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়।
কেন সরকারি সহায়তা কৃষকের কাছে পৌঁছে না?
অধ্যাপক এম এ রহিম: তার অনেকগুলো কারণ আছে। অনেক প্রকল্প নেওয়ার পরও দুর্নীতির কারণে প্রণোদনার অর্থ সঠিক কৃষক পান না। অথচ এখন কৃষি থেকেই আমরা অনেক কিছু নিচ্ছি। দেশের কৃষক দেশকে উজাড় করে দিচ্ছে। আমাকে দিচ্ছে, আমার সন্তানদেরকে দিচ্ছে। সেই কৃষকের জন্য কিছু দেওয়া উচিত- এই উপলব্ধি যেদিন আসবে সেদিনই আমাদের দেশের উন্নতি হবে, দেশ সমৃদ্ধ হবে।
বর্তমানে জ্বালানি পরিস্থিতিতে কৃষির সংকট সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?
অধ্যাপক এম এ রহিম: এটি শুধু বাংলাদেশের নয়, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেরও ফল। তবে নীতিনির্ধারণে আগাম প্রস্তুতির ঘাটতি স্পষ্ট। জ্বালানি, সার ও কৃষিপণ্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে দূরদর্শিতার অভাব ছিল বলেই বর্তমান পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। প্রশাসনিক ও সামাজিক অনেক স্তরেই দায়িত্ব পালনে অবহেলা রয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত কৃষক ও সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব ফেলে। শুধু আইন প্রয়োগ নয়, বরং মানসিক পরিবর্তনও জরুরি। সরকারের সদিচ্ছা থাকলে অনেক সমস্যাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। অতীতে কঠোর সিদ্ধান্ত ও সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অনেক জটিল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা গেছে।
কৃষিতে ডিজেল সংকটের বড় প্রভাব পড়েছে। এটি কিভাবে কাটিয়ে ওঠা যায়?
অধ্যাপক এম এ রহিম: আমরা কেন আগেভাগে সার, জ্বালানি বা কৃষিপণ্য মজুত করলাম না? ইরানকে আজ না কাল হোক আমেরিকা আক্রমণ করতো। এটাতে আমাদের দূরদর্শিতার অভাব রয়ে গেছে। দ্বিতীয়ত কথা, আমি কেন দুর্নীতি কন্ট্রোল করতে পারছি না? খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষিতে ডিজেলের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে বিকল্প উৎস থেকে আমদানি ও ভর্তুকি দিতে হবে। নীতিনির্ধারকদের এটা মনে রাখা জরুরি যে জ্বালানি অনিশ্চয়তার কারণে খাদ্য উৎপাদনে যদি ঘাটতি দেখা দেয়, তাহলে যে সংকট সৃষ্টি হতে পারে, সেটা সামাল দেওয়া কঠিন হবে।
দুর্নীতি ও জবাবদিহির প্রশ্নে আপনার অবস্থান কী?
অধ্যাপক এম এ রহিম: আমি একটা কথা সবসময় বলি, দুর্নীতি শুধু বড় বড় জায়গায় হয় না। একজন শিক্ষক যদি ঠিকমতো ক্লাস না নেন, সেটাও দুর্নীতি। একজন কর্মকর্তা যদি দায়িত্ব পালন না করেন, সেটাও দুর্নীতি। কারণ তিনি জনগণের ট্যাক্সের টাকায় বেতন পান। আমাদের মধ্যে দায়িত্ববোধ তৈরি করতে হবে। এই দেশের মাটি, মানুষ, পরিবেশ আমাদের যে সুযোগ দিয়েছে, তার প্রতি দায়বদ্ধতা থাকতে হবে। এই উপলব্ধি যতদিন না আসবে, ততদিন প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়।
কৃষিতে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের বর্তমান অগ্রগতি আপনি কীভাবে দেখছেন?
অধ্যাপক এম এ রহিম: কৃষিবিদদের কাজের কারণে এখন আমরা তাপসহিষ্ণু সবজির চাষ করতে পারছি। ফলে শীতের সবজিও এখন সারা বছর পাওয়া যাচ্ছে। শুধু শীতকালীন সবজি নয়, প্রায় সব ধরনের সবজিই এখন বছরজুড়ে বাজারে পাওয়া যায়। এমনকি নানা রকম মৌসুমী ফলও এখন সারা বছর পাওয়া যাচ্ছে। এটা কৃষির জন্য বড় ইতিবাচক পরিবর্তন। স্বাদে কিছু পার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু প্রাপ্যতা নিশ্চিত হয়েছে। পাশাপাশি কৃষকেরাও ভালো দাম পাচ্ছেন।
কৃষিতে আধুনিক আর কোন কোন ধরনের প্রযুক্তি সংযোজন করা যেতে পারে?
অধ্যাপক এম এ রহিম: টিস্যু কালচার আমাদের দেশের কৃষিতে বিপ্লব ঘটাতে পারে। ভাইরাসমুক্ত ও উন্নতমানের চারা উৎপাদনের ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তির বিকল্প এখনো সীমিত। সাধারণ গ্রাফটিং বা প্রাকৃতিক প্রজনন পদ্ধতিতে অনেক সময় রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না। কিন্তু টিস্যু কালচারের মাধ্যমে নির্ভরযোগ্য, রোগমুক্ত এবং মানসম্পন্ন চারা উৎপাদন করা যায়। যা কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন এনেছে। যেসব ফসল সহজে বংশবিস্তার করা যায় না কিংবা বৃহৎ পরিসরে উৎপাদন করা কঠিন সেগুলোর জন্য টিস্যু কালচার অত্যন্ত কার্যকর। একইভাবে উচ্চমূল্যের এবং সীমিত প্রাপ্যতার চারা উৎপাদনেও এই প্রযুক্তি বড় ভূমিকা রাখছে। থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়াসহ নানা দেশ এই প্রযুক্তির সফল ব্যবহার করছে। আমরা যদি নেদারল্যান্ডের দিকে যাই, তাদের টিউলিপ বলি, নার্সারি বলি—সবকিছুরই চারা টিস্যু কালচারের মাধ্যমে হচ্ছে। বাংলাদেশেও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের টিস্যু কালচার প্রকল্পের আওতায় এখন কলা, স্ট্রবেরিসহ বিভিন্ন ফসলের টিস্যু কালচার চারা উৎপাদন শুরু হয়েছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় টিস্যুকালচার ল্যাবরেটরি নির্মাণ হচ্ছে। ভবিষ্যতে এসব ল্যাব পূর্ণ সক্ষমতায় পৌঁছালে দেশে বিপুল পরিমাণ মানসম্পন্ন চারা উৎপাদন সম্ভব হবে।
কৃষিতে তরুণদের আগ্রহ কেমন?
অধ্যাপক এম এ রহিম: তরুণেরাই এখন কৃষির প্রাণ। নিশ্চিত মুনাফা আছে, এমন খাতগুলোতে তরুণেরা বিনিয়োগ করছেন। তরুণ প্রজন্ম কৃষিকে এখন আর শুধু প্রথাগত পদ্ধতিতে সীমাবদ্ধ রাখতে চান না। তাঁরা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃষির উন্নতি ঘটানোর চেষ্টা করছেন।
তরুণদের কৃষিতে সম্পৃক্ততায় কোনো চ্যালেঞ্জ আছে?
অধ্যাপক এম এ রহিম: মূল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে প্রশিক্ষণের অভাব। তরুণদের আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তির ব্যবহার, চাষাবাদ, বাজারজাত, সংযোগ তৈরিসহ নানা বিষয়ে দক্ষ করে তোলার জন্য প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বাড়াতে হবে। সরকারের বেশ কয়েকটি ভালো উদ্যোগ আছে। এরমধ্যেম আমি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের একটি প্রকল্পের কৃষি উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত আছি। সাভারে রাজালাখ হর্টিকালচার সেন্টারে তিনদিনের আবাসিক এই প্রশিক্ষণে ইতোমধ্যে সাড়ে তিন হাজার তরুণ প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। এখানে শুধু কৃষি সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষকই নন, শিক্ষা ও উন্নয়ন খাতের বিভিন্ন পেশার মানুষও যুক্ত হন। ফলে একটি বহুমাত্রিক শেখার পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কেউ হঠাৎ করেই উদ্যোক্তা হয়ে ওঠেন না। কিন্তু এখান থেকে মানসিক পরিবর্তন তৈরি হয়। অংশগ্রহণকারীরা উদ্যোক্তা হওয়ার প্রয়োজনীয়তা ও সম্ভাবনা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পান। কৃষি উদ্যোক্তা হওয়ার পথে কীভাবে এগোতে হবে, কী ধরনের চ্যালেঞ্জ আসতে পারে, বাস্তব অভিজ্ঞতায় সেগুলো কীভাবে মোকাবিলা করা যায়- এসব বিষয়ে তারা ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জন করেন। বাস্তব উদ্যোক্তারা এবং মাঠপর্যায়ে সফল হওয়া কৃষকদের অভিজ্ঞতা এখানে তুলে ধরা হয়, যা প্রশিক্ষণকে আরও কার্যকর করে তোলে। এতে অংশগ্রহণকারীরা শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান নয়, বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করেন। প্রশিক্ষণ শেষে অনেকেই নিজেদের কাজে সেই শিক্ষা প্রয়োগ করছেন। এভাবে সরকারি প্রশিক্ষণগুলো বাস্তমুখী করতে হবে।
উৎপাদন বাড়লেও পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না কৃষক। এই সমস্যা থেকে উত্তরণের পথ কি?
অধ্যাপক এম এ রহিম: বাংলাদেশে কৃষিপণ্য উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও উৎপাদনের পরবর্তী ব্যবস্থাপনা এখনো বড় দুর্বলতা হিসেবে রয়ে গেছে। উৎপাদনের পর সংরক্ষণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণ—এই পুরো পোস্ট-হারভেস্ট পর্যায়ে গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রম খুবই সীমিত। এর ফলে অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদিত কৃষিপণ্যের ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত নষ্ট হয়ে যায়। যা দেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এই অপচয়ের একটি প্রধান কারণ হলো পোস্ট-হারভেস্ট হ্যান্ডলিং বিষয়ে আমাদের অজ্ঞতা ও অবহেলা। কৃষক পর্যায়ে সঠিক সংরক্ষণ, গ্রেডিং, প্যাকেজিং ও বাজারজাতকরণ পদ্ধতি সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান ও প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে। একই সঙ্গে আধুনিক সংরক্ষণ অবকাঠামোর ঘাটতিও বড় একটি সমস্যা। বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই ফলমূল ও শাকসবজির জন্য আলাদা আলাদা কোল্ড স্টোরেজ ব্যবস্থা রয়েছে। যেখানে পণ্যের ধরন অনুযায়ী তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে কোল্ড স্টোরেজ বলতে মূলত আলু সংরক্ষণকেন্দ্রিক ব্যবস্থা বোঝানো হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে মাল্টি-চেম্বার কোল্ড স্টোরেজ গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা এখনো পর্যাপ্ত নয়। এক্ষেত্রে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্যোগে নির্মিত ‘ফার্মারস মিনি কোল্ড স্টোরেজ’ সম্ভাবনাময় পদক্ষেপ। গ্রাম পর্যায়ে ছোট আকারের এই সংরক্ষণ সুবিধা কৃষকদের জন্য বড় সহায়ক হতে পারে। যখন বাজারে দাম কম থাকে বা সরবরাহ বেশি থাকে, তখন কৃষকেরা অল্প সময়ের জন্য পণ্য সংরক্ষণ করে পরে বিক্রি করতে পারবেন। এতে তারা ন্যায্য মূল্য পাওয়ার সুযোগ পাবেন। শুধু কৃষক নয়, খুচরা ব্যবসায়ী ও সুপারমার্কেটগুলোর জন্যও এই ধরনের ছোট কোল্ড স্টোরেজ কার্যকর হতে পারে। অনেক সময় সরবরাহ চেইনে বিঘ্ন ঘটে, তখন নিজেদের সংরক্ষণ সুবিধা থাকলে তারা বাজারে পণ্যের সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে পারবেন। আমি মনে করি, ফার্মারস মিনি কোল্ড স্টোরেজ দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন পর্যায়ে বিস্তৃত করা গেলে কৃষি বিপণন ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসবে। কৃষকেরা সরাসরি উপকৃত হবেন, অপচয় কমবে এবং বাজারে দামের অস্থিরতাও কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসবে। তবে এই উদ্যোগ সফল করতে হলে সরকারের সক্রিয় ভূমিকা অপরিহার্য। প্রণোদনা, সহজ ঋণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে এই খাতকে এগিয়ে নিতে হবে। পাশাপাশি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও কার্যকর মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে। কৃষির টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে শুধু উৎপাদন বাড়ানোই যথেষ্ট নয়—উৎপাদনের পরের ব্যবস্থাপনাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। এখন সময় এসেছে পোস্ট-হারভেস্ট ব্যবস্থাপনাকে কৃষি উন্নয়নের কেন্দ্রীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করার।
ভবিষ্যতের কৃষি উন্নয়নের জন্য কী জরুরি বলে মনে করেন?
অধ্যাপক এম এ রহিম: আমাদের টেকসই কৃষির দিকে যেতে হবে। উন্নত জাত ও প্রযুক্তির পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে কৃষকবান্ধব নীতি, সঠিক বাজেট বরাদ্দ, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রযুক্তির বিস্তার নিশ্চিত করতে হবে। কৃষিকে যদি আমরা সত্যিকার অর্থে অগ্রাধিকার দিই, তাহলে এই খাত দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী ভিত্তি দিতে পারবে। কৃষিকে অবহেলা করলে উন্নয়ন টেকসই হবে না; আর গুরুত্ব দিলে এই খাতই দেশকে সামনে এগিয়ে নেবে।
