Logo
×

Follow Us

পরিবেশ ও জলবায়ু

ঢাকার বুকেই প্রকৃতির ঠিকানা গড়ে তুলছেন রকিবুল আমিন

Icon

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০১ আগস্ট ২০২৬, ১৪:৩৪

ঢাকার বুকেই প্রকৃতির ঠিকানা গড়ে তুলছেন রকিবুল আমিন

ঘাসে পা রাখতেই নরম এক অনুভূতি। পাশে টলটলে পানির লেকে মাছের ছুটোছুটি। বাতাসে দুলছে বাঁশের পাতা। কাঠের দোলনায় বসে গল্প করছেন কেউ, আবার কেউ মোবাইল ফোনে বন্দী করছেন চারপাশের দৃশ্য। দূর থেকে দেখলে মনে হবে, কোনো গ্রামের বাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়িয়েছেন। অথচ জায়গাটি রাজধানীর শেরেবাংলা নগর। জাতীয় বৃক্ষমেলার ভেতরে গড়ে তোলা হয়েছে এমন এক সবুজ পরিসর, যেখানে কয়েক মুহূর্তের জন্য হলেও ভুলে যাওয়া যায় শহরের যানজট, কংক্রিট আর ধুলোর কথা।

এই ছোট্ট গ্রামের নেপথ্যে রয়েছেন মো. রকিবুল আমিন। তিনি শুধু একজন উদ্যোক্তা নন; প্রকৃতিকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ করে তোলার এক নিরলস স্বপ্নবাজ। তাঁর প্রতিষ্ঠানের নাম ‘গার্ডেনিং বাংলাদেশ’। ছাদ, বারান্দা, অফিস, দেয়াল কিংবা ছোট্ট একটি ঘরের কোণ—যেখানে সামান্য জায়গা পাওয়া যায়, সেখানেই প্রকৃতির ছোঁয়া পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করে তাঁর প্রতিষ্ঠান।

রকিবুলের গল্প আসলে কংক্রিটের শহরে হারিয়ে যেতে বসা সবুজকে ফিরিয়ে আনার গল্প।

গ্রামের উঠোন থেকে শহরের স্বপ্ন

কুষ্টিয়ার এক সবুজ পরিবেশে বেড়ে ওঠা রকিবুলের শৈশব কেটেছে গাছপালা আর ফুলের বাগানের মধ্যে। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই নিজের বাড়ির আঙিনায় গোলাপসহ নানা ফুলের বাগান করেছিলেন। সেই বাগান দেখতে আশপাশের মানুষও আসতেন।

গাছের সঙ্গে সম্পর্কটা তখন শখের ছিল, পরে তা হয়ে ওঠে জীবনের দর্শন। ২০০১ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকায় আসেন। ঢাকা কলেজে উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হওয়ার পর যেন নতুন এক বাস্তবতা তাঁকে নাড়িয়ে দেয়। চারদিকে উঁচু ভবন, কংক্রিটের দেয়াল, ব্যস্ত সড়ক। গাছের সংখ্যা কমছে, খোলা জায়গা হারিয়ে যাচ্ছে। শিশুরা মাটিতে খেলে না, পাতার গন্ধ চেনে না। রকিবুল বলেন, বড় হয়ে দেখি শহরে মানুষ চার দেয়ালের মধ্যে আবদ্ধ। সবুজ বলে কিছু নেই। এই অভাবটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছিল। তখনই মনে হয়েছিল, মানুষের ঘরে যদি প্রকৃতির স্পর্শ ফিরিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে শহরও কিছুটা প্রাণ ফিরে পাবে।

লোকসান থেকে শেখা

উদ্যোক্তা হওয়ার শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না। ছাত্রাবস্থায় বিশ্ব ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে ১৪ হাজার টাকার গোলাপ কিনে শাহবাগে বিক্রি শুরু করেন। এক ঘণ্টার মধ্যেই বিক্রি জমে ওঠে। কিন্তু হঠাৎ বৃষ্টি নেমে সব ফুল নষ্ট হয়ে যায়। বড় ধরনের লোকসান হয়। অনেকে হয়তো সেখানেই থেমে যেতেন। রকিবুল থামেননি। ২০০৮ সালে বসুন্ধরা সিটিতে ছোট্ট একটি দোকান ভাড়া নেন। নাম দেন ‘একেশিয়া’। শুরুতে ব্যবসা খুব একটা ভালো চলেনি। কিন্তু একদিন ইনডোর প্লান্ট বিক্রি করে প্রায় ৭৫ হাজার টাকা আয় করেন। সেই দিনই বুঝতে পারেন, শুধু ফুল বিক্রি নয়, মানুষের ঘরে প্রকৃতিকে ফিরিয়ে আনার মধ্যেই ভবিষ্যৎ লুকিয়ে আছে। কিন্তু এক পর্যায়ে বসুন্ধরা কর্তৃপক্ষ সিন্ধান্ত নেয় মার্কেটে আর ফুল দোকান না রাখার। ফলে সেই দোকানটিও রকিবুল ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। তখন তিনি খুব চিন্তায় পড়ে যান।

পরে রকিবুল গড়ে তুলেন নতুন প্রতিষ্ঠান, প্রতিষ্ঠানের নাম বদলে রাখা হয় ‘গার্ডেনিং বাংলাদেশ’। ২০১৯ সালে সেটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিষ্ঠানে রূপ নেয়। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সড়ক, রিসোর্ট, করপোরেট প্রতিষ্ঠান, পোশাক কারখানা, আবাসন প্রকল্প, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, ইকোপার্ক, লেক ও ব্যক্তিগত বাড়িতে সবুজায়নের কাজ করছে। ইতিমধ্যে শতাধিক ছোট-বড় ল্যান্ডস্কেপ প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে তারা।

রকিবুলের কাছে গাছ কেবল শোভাবর্ধনের উপকরণ নয়। তাঁর কাছে এটি মানুষের সুস্থতারও অংশ। তিনি বলেন, সবুজটা হারিয়ে যাচ্ছে। মানুষ গাছের পাতা ছুঁয়ে দেখার অভ্যাসও হারিয়ে ফেলছে। আমি চাই প্রত্যেক মানুষ প্রতিদিন অন্তত একবার গাছের সঙ্গে সময় কাটাক। একটি গাছ শুধু অক্সিজেন দেয় না, মানুষের মনও ভালো রাখে। সবুজ দেখলে চোখের ক্লান্তি দূর হয়, মন শান্ত হয়।

এই ভাবনা থেকেই তিনি এখন ‘জিরো সয়েল’ ধারণা নিয়ে কাজ করছেন। তাঁর মতে, কোনো খোলা মাটি অনাবৃত রাখা উচিত নয়। ঘাস, লতা কিংবা অন্য কোনো উদ্ভিদ দিয়ে প্রতিটি ফাঁকা জায়গা ঢেকে দেওয়া সম্ভব। এতে যেমন শহর সবুজ হবে, তেমনি তাপপ্রবাহ কমানো, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলাতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

রকিবুল এখন ‘গার্ডেন মিশন’ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছেন। তাঁর লক্ষ্য, নগর সবুজায়নকে একটি সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করা। পাশাপাশি পলিথিনের ব্যবহার কমানো এবং পরিবেশবান্ধব জীবনযাপন জনপ্রিয় করতেও কাজ করতে চান। তিনি বলেন, আমি চাই আগামী প্রজন্ম এমন একটি বাংলাদেশ পাক, যেখানে গাছের জন্য আলাদা করে খুঁজতে হবে না। প্রতিটি ছাদ, প্রতিটি বারান্দা, প্রতিটি স্কুল, প্রতিটি অফিসে অন্তত কিছুটা সবুজ থাকবে।

দীর্ঘদিনের এই প্রচেষ্টার স্বীকৃতি হিসেবে এবার পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ‘বৃক্ষরোপণে জাতীয় পুরস্কার–২০২৫’-এ বৃক্ষ গবেষণা, সংরক্ষণ ও উদ্ভাবন শাখায় জাতীয় পরিবেশ পুরস্কার পেয়েছেন রকিবুল আমিন। তবে তাঁর কাছে পুরস্কার কোনো গন্তব্য নয়, বরং নতুন পথচলার প্রেরণা। তিনি বলেন, এই পুরস্কার আমাকে আরও বড় দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়। আমি চাই মানুষ আবার গাছের কাছে ফিরুক। কারণ একটি সবুজ শহর মানেই শুধু সুন্দর শহর নয়, বাসযোগ্য শহরও। ঢাকা প্রতিদিন আরও উঁচু হচ্ছে, আরও ঘন হচ্ছে কংক্রিটের দেয়াল। সেই শহরেই যদি একটি ছাদ, একটি বারান্দা, একটি অফিস কিংবা একটি কাচের পাত্রেও জন্ম নেয় এক টুকরো বন, তবে হয়তো মানুষ আবার প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কটা নতুন করে গড়ে তুলতে পারবে। আমরা সেই সম্পর্ক ফিরিয়ে আনার কাজটিই করে যাচ্ছি। একটি সবুজ শহর, একটি সবুজ বাংলাদেশ আর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আরও বাসযোগ্য একটি পৃথিবীর স্বপ্ন বুকে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি।

Logo