জিআই স্বীকৃত নরসিংদীর লটকনে ১৪৬ কোটি টাকার সম্ভাবনা, কম দামে হতাশ চাষি
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬, ১৬:৩১
ছবি- সংগ্রহ
এক সময় বনজঙ্গল ও ঝোপঝাড়ে স্বাভাবিকভাবে জন্মানো লটকনকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হতো না। তবে পুষ্টিগুণের কারণে ভোক্তাদের আগ্রহ বৃদ্ধি এবং বাজারে চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ফলটি এখন দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় অর্থকরী ফল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। স্থানীয়ভাবে ‘বুগি’ নামে পরিচিত নরসিংদীর লটকন ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পাওয়ায় এর বাণিজ্যিক গুরুত্ব আরও বেড়েছে। বর্ষাকালে গাছের কাণ্ডজুড়ে ঝুলে থাকা সোনালি লটকনের থোকা যেমন প্রকৃতিতে সৌন্দর্য ছড়িয়ে দেয়, তেমনি হাজারো কৃষক পরিবারের জীবিকায়ও নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।
নরসিংদীর শিবপুর, বেলাব ও রায়পুরা উপজেলায় বর্তমানে ব্যাপক পরিসরে লটকনের চাষ হচ্ছে। এই তিন উপজেলাকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে জেলার প্রধান লটকন উৎপাদন অঞ্চল। কৃষির পাশাপাশি অনেক শিক্ষিত তরুণও বাণিজ্যিকভাবে লটকনের বাগান গড়ে তুলে আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছেন।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নরসিংদীর লাল মাটিতে ক্যালসিয়ামসহ প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদান থাকায় এখানে লটকনের ফলন অন্যান্য এলাকার তুলনায় ভালো হয়। চলতি মৌসুমে জেলায় প্রায় ২ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে লটকনের আবাদ হয়েছে। উৎপাদন ৩০ হাজার মেট্রিক টন অতিক্রম করবে বলে আশা করা হচ্ছে। বর্তমান বাজারমূল্য বিবেচনায় এ উৎপাদনের সম্ভাব্য আর্থিক মূল্য প্রায় ১৪৬ কোটি টাকা।
তবে উৎপাদন সন্তোষজনক হলেও বাজারমূল্য নিয়ে হতাশ কৃষকরা। তাদের দাবি, মৌসুমের শুরু থেকেই প্রতি কেজি লটকন গত বছরের তুলনায় ৩০ থেকে ৫০ টাকা কম দামে বিক্রি হচ্ছে। ফলে উৎপাদন বেশি হলেও প্রত্যাশিত মুনাফা পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
লটকন চাষি করিম চৌধুরী জানান, তিনি নিজের বাগানের ফল সরাসরি পাইকারি বাজারে বিক্রি করেন। এতে মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর নির্ভর করতে হয় না এবং তুলনামূলক ভালো দাম পাওয়া যায়। তিনি আশা করছেন, চলতি মৌসুমে তিন বিঘা জমির লটকন বিক্রি করে প্রায় ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা আয় করবেন।
তিনি আরও বলেন, লটকন চাষে পরিচর্যার ব্যয় তুলনামূলক কম হলেও বল্লা পোকার আক্রমণ বড় চ্যালেঞ্জ। এ পোকা ফলের গায়ে ছিদ্র করে, যার ফলে আক্রান্ত ফল ঝরে পড়ে। তবে কীটনাশকযুক্ত ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার করলে এ সমস্যার প্রকোপ অনেকটাই কমানো সম্ভব।
পাইকারি ব্যবসায়ী হিমেল জানান, মৌসুমের শুরুতেই তিনি সাতটি লটকনের বাগান কিনেছেন। এসব বাগান কিনতে প্রায় ৩০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছেন। বাজার পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে ফল বিক্রি শেষে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা লাভের আশা করছেন।
নরসিংদী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ আজিজুল হক বলেন, নরসিংদীর মাটি ও আবহাওয়া লটকন উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত অনুকূল। অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এবার ফলনও আশাব্যঞ্জক হয়েছে। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে মাঠপর্যায়ে কৃষকদের নিয়মিত কারিগরি পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, লটকনকে আরও লাভজনক ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক করতে রোগবালাই দমন, ফলের গুণগত মান উন্নয়ন এবং উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবনে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা প্রয়োজন। এ জন্য বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ সংশ্লিষ্ট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণার উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। তাঁর মতে, গবেষণার মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও রোগ প্রতিরোধ সক্ষমতা বাড়ানো গেলে ভবিষ্যতে লটকন চাষ আরও বিস্তৃত হবে এবং কৃষকরাও অধিক লাভবান হবেন।
