Logo
×

Follow Us

অর্থনীতি

বিদায়ী ২০২৫: পেঁয়াজের অস্থিরতা, আলুর দরপতন ও ভোজ্যতেলের মূল্যচাপ

Icon

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০১ জানুয়ারি ২০২৬, ২১:২৫

বিদায়ী ২০২৫: পেঁয়াজের অস্থিরতা, আলুর দরপতন ও ভোজ্যতেলের মূল্যচাপ

ছবি সংগৃহীত

বিদায়ী ২০২৫ সালে দেশের নিত্যপণ্যের বাজারে সবচেয়ে বেশি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল পেঁয়াজ, আলু ও ভোজ্যতেল। বছরের বিভিন্ন সময়ে ডিম, সবজি ও ডিমও খাবার টেবিলের আলোচনায় জায়গা করে নেয়। দাম ওঠানামা, উৎপাদন পরিস্থিতি, আমদানিনির্ভরতা এবং নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণে এসব পণ্যের বাজারে নানা প্রভাব পড়ে। ফলে ভোক্তাদের বছরজুড়ে বাড়তি খরচের চাপ বহন করতে হয়েছে।

বাজার বিশ্লেষকরা জানান, কোনো পণ্যের দাম বাড়লে ভোক্তা বাড়তি চাপের মুখে পড়েন, আর দাম কমে গেলে কৃষক ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন। তাই সরবরাহ ব্যবস্থা ও বাজার ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।

কারসাজি ও চাপে পেঁয়াজ আমদানি

চলতি বছর এক-দেড় মাসের জন্য পেঁয়াজের বাজার ব্যাপক আলোচনায় উঠে আসে। বছরের শুরুতে দেশীয় উৎপাদন ও আগের মৌসুমের মজুতের কারণে দাম কিছুটা সহনীয় থাকলেও তৃতীয় প্রান্তিকে এসে বাজারে সরবরাহ সংকট দেখা দেয়। এতে বাজার অস্থির হয়ে ওঠে এবং দাম বেড়ে কেজি ১৫০ টাকা পর্যন্ত পৌঁছে যায়। সরকার একাধিকবার আমদানির সিদ্ধান্ত নিলেও কৃষকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার চিন্তা থেকে শুরুতে আমদানির অনুমতি দেয়নি। তবে বাজার নিয়ন্ত্রণ ও আমদানিকারকদের চাপে শেষ পর্যন্ত ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি দিতে বাধ্য হয় সরকার। আমদানি করা পেঁয়াজ বাজারে আসার পর দাম অনেকটা কমে আসে।

আলুতে স্বস্তি ভোক্তার, হতাশা কৃষকের

পেঁয়াজের বাজারের বিপরীত চিত্র দেখা যায় আলুর বাজারে। গত মৌসুমে চাহিদার তুলনায় প্রায় ১০ লাখ টন বেশি আলু উৎপাদন হয়েছে। কিন্তু আলুর রপ্তানি ও বিকল্প ব্যবহার বাড়াতে না পারায় বাজারে উদ্বৃত্ত আলুর চাপ তৈরি হয়। হিমাগারগুলোয় পাঁচ-ছয় লাখ টন অতিরিক্ত আলু মজুত থাকায় পাইকারি বাজারে কেজি পাঁচ-ছয় টাকায় বিক্রি হয় আলু, যেখানে উৎপাদন ব্যয় ছিল এলাকাভেদে ১৭ থেকে ২২ টাকা। হিমাগার ভাড়া ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক কৃষক বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েন।

পুরোনো আলুর পর্যাপ্ত মজুতের মধ্যেই আগাম জাতের নতুন আলু বাজারে প্রবেশ করে। সাধারণত নতুন আলুতে কৃষক ভালো দাম পেলেও এবার নতুন আলুর দামও ১৫ থেকে ২০ টাকায় নেমে আসে। কৃষকের এমন হতাশার চিত্র নীতিনির্ধারকদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, আগামী বছর লোকসানের ভয়ে অনেক চাষি আলু আবাদ থেকে সরে আসতে পারেন।

বছরের শেষে ভোজ্যতেলে খরচের চাপ

বছরের বেশিরভাগ সময় ভোজ্যতেলের বাজার স্থিতিশীল থাকলেও বছরের শেষ দিকে আমদানিকারক ও পরিশোধনকারীরা বিভিন্ন অজুহাতে দাম বাড়ানোর চেষ্টা করেন। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধি, ডলার সংকট ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির অজুহাতে বছরের মাঝামাঝি বাণিজ্য মন্ত্রণায়ের অনুমতি ছাড়াই দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেয় ভোজ্যতেল পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। তবে সরকার তাতে সম্মতি না দেওয়ায় সেই দাম কার্যকর হয়নি।

কিন্তু বছরের শেষ প্রান্তিকে কোনো ঘোষণা ছাড়াই বাজারে লিটারে ৯ টাকা বেশি দামে তেল সরবরাহ শুরু করেন তারা। সরকার পরে হস্তক্ষেপ করলেও শেষ পর্যন্ত ব্যবসায়ীদের প্রস্তাবে সম্মতি দিতে বাধ্য হয়। ফলে সয়াবিন ও পাম অয়েলের দাম লিটারে যথাক্রমে ৬ ও ১৪ টাকা বৃদ্ধি পায়, যা সাধারণ পরিবারের খরচ বাড়িয়ে দেয়।

কিছু সময় সবজি ও চালের বাজারেও উত্তাপ

বর্ষা ও অমৌসুমি বৃষ্টির সময় সরবরাহ কমে যাওয়ায় কাঁচামরিচ, টমেটো ও শাকসবজির দাম হঠাৎ বেড়ে যায়। মৌসুম স্বাভাবিক হলে সরবরাহ বাড়তে শুরু করে এবং দামও কমে আসে।

গত বছর চালের বাজারও ছিল অস্থির। সরু চালের কেজি ৮৫, মাঝারি ৬৫ ও মোটা চাল ৫৮ টাকা পর্যন্ত ওঠে। বছরের অর্ধেকের বেশি সময় চালের বাজারে উত্তাপ থাকলেও সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে চাল আমদানি ও নতুন ধান ওঠা শুরু হলে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে।

ডিমমুরগিতে ছিল না বড় আলোচনা

ডিম ও মুরগির বাজার এ বছর তুলনামূলক নাগালের মধ্যেই ছিল। বর্তমানে ডিমের ডজন ১০৫ থেকে ১১০ এবং ব্রয়লারের কেজি ১৫৫ থেকে ১৬৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা অন্যান্য বছরের তুলনায় তেমন আলোচনার জন্ম দেয়নি।

ভোক্তা ও কৃষকউভয়েরই ক্ষতি

সার্বিক বিষয়ে কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, বিদায়ী বছরে কিছু পণ্যের দাম অস্বাভাবিক বেড়েছিল, যা ভোক্তাদের বিপাকে ফেলেছে। আবার দু-একটি কৃষিপণ্যের দাম এতটাই কমে গিয়েছিল যে কৃষক উৎপাদন খরচও তুলতে পারেননি। অতি মূল্য ও দাম পড়ে যাওয়াদুটিই বাজারে শৃঙ্খলা নষ্ট করে।

Logo