Logo
×

Follow Us

প্রাণিসম্পদ

প্রাণিজ পণ্য রপ্তানিতে বড় উল্লম্ফন, আয় বেড়েছে তিনগুণ

ছয় মাসে রপ্তানি আয় বেড়েছে ২১৭ শতাংশ

Icon

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ২৩:৩২

প্রাণিজ পণ্য রপ্তানিতে বড় উল্লম্ফন, আয় বেড়েছে তিনগুণ

দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও বাড়ছে প্রাণিজ পণ্যের রপ্তানি। দুধ, মাংস ও ডিম উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে রপ্তানিমুখী এ খাতের আয়ও বাড়ছে। ২০২৬ সালের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ছয় মাসে প্রাণিজ পণ্য রপ্তানি করে আয় হয়েছে ১ কোটি ৪ লাখ ৬৩ হাজার ৭২৭ ডলার। আগের ছয় মাসের তুলনায় এ আয় বেড়েছে ২১৭ দশমিক ২০ শতাংশ।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ছয় মাসে প্রাণিজ পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছিল ৩২ লাখ ৯৮ হাজার ৬৬২ ডলার। পরবর্তী ছয় মাসে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৪ লাখ ৬৩ হাজার ৭২৭ ডলারে। অর্থাৎ ছয় মাসের ব্যবধানে রপ্তানি আয় বেড়েছে ৭১ লাখ ৬৫ হাজার ৬৫ ডলার।

মাসভিত্তিক হিসাবেও রপ্তানি আয়ের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। ২০২৬ সালের মার্চে আয় হয়েছিল ৬ লাখ ৭৮ হাজার ১২৯ ডলার। এপ্রিলে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১০ লাখ ৪৮ হাজার ৯০৩ ডলারে। মে মাসে আয় কিছুটা কমে ৭ লাখ ৫০ হাজার ৮০৮ ডলার হলেও জুনে তা বেড়ে হয় ১১ লাখ ৯৮ হাজার ৭৭৮ ডলার। জুলাইয়ে আয় হয় ১৯ লাখ ৫ হাজার ১৪ ডলার। আগস্টে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৮ লাখ ৮২ হাজার ৯৫ ডলারে। শুধু আগস্ট মাসের রপ্তানি আয় আগের ছয় মাসের সম্মিলিত আয়ের চেয়েও বেশি।

রপ্তানি আয়ের এই প্রবৃদ্ধি পরবর্তী অর্থবছরের প্রথম তিন মাসেও অব্যাহত রয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রাণিজ পণ্য রপ্তানি করে আয় হয়েছে ২ কোটি ৪৭ লাখ ২৩ হাজার ৬৩৮ ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৩০৯ কোটি ৪ লাখ ৫৪ হাজার ৭৮১ টাকা। 

প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাজারে হালাল পণ্যের চাহিদা এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণের উদ্যোগ প্রাণিজ পণ্য রপ্তানিতে সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে টেকসই অবস্থান তৈরি করতে পণ্যের গুণগত মান, খাদ্যনিরাপত্তা, রোগ নিয়ন্ত্রণ, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।

৬ বছরে রপ্তানি আয় তিনগুণের বেশি

প্রাণিজ পণ্য রপ্তানিতে গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে। প্রাণিসম্পদ খাতের রপ্তানি বিবরণী অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে এ খাত থেকে আয় হয়েছিল ৫১ কোটি ৯০ লাখ টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৮ কোটি ৭ লাখ টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে রপ্তানি আয় বেড়ে হয় ৯৯ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। তবে পরের অর্থবছরে তা কমে ৫৮ কোটি ৫২ লাখ টাকায় দাঁড়ায়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রাণিজ পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয় ৭২ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। পরের অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১০২ কোটি ৫১ লাখ টাকা। আর চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জানুয়ারি পর্যন্ত রপ্তানি আয় হয়েছে ৩০৯ কোটি ৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসেই আগের অর্থবছরের পুরো সময়ের তুলনায় প্রায় তিন গুণ রপ্তানি আয় হয়েছে।

প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন ধরনের প্রাণিজ পণ্য রপ্তানি হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে মাংস ও মাংসজাত পণ্য, বুল স্টিক, দধি, রসমালাই, মিষ্টি, হাঁসের পালক, জিলেটিন, গরুর লেজের লোম, কবুতর, ওম্যাজাম, মোগলাই পরোটা, মহিষ ও গরুর শিং, টুকরা চামড়া এবং ভেটেরিনারি মেডিসিন সাপ্লিমেন্ট। এসব পণ্যের আমদানিকারক দেশের মধ্যে রয়েছে মালদ্বীপ, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর, নাইজেরিয়া, ভিয়েতনাম, চীন, ইন্দোনেশিয়া, ইতালি, মালয়েশিয়া, মিসর, কুয়েত, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড, ফ্রান্স, দক্ষিণ কোরিয়া, হংকং ও নেপাল।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ খাতকে রপ্তানিমুখী শিল্পে রূপান্তরে সরকার কাজ করছে। দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারের উপযোগী নিরাপদ, মানসম্মত ও হালাল প্রাণিজ পণ্য উৎপাদনে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, এ লক্ষ্যে প্রাণীরোগ নিয়ন্ত্রণ, আধুনিক খামার ব্যবস্থাপনা, আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষাগার ও সনদায়ন ব্যবস্থা এবং নতুন রপ্তানি বাজার অনুসন্ধানে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। হ্যাচিং এগ রপ্তানির মাধ্যমে এ খাতের আন্তর্জাতিক সম্ভাবনা ইতিমধ্যে উন্মোচিত হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনই সরকারের লক্ষ্য।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, প্রাণিজাত পণ্যের উৎপাদন ও গুণগত মান বৃদ্ধি, নিরাপদ ও রোগমুক্ত উৎপাদনব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রাণিজাত পণ্যের রপ্তানি বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পাশাপাশি খামারি ও উদ্যোক্তারা লাভবান হবেন। জাতীয় অর্থনীতিতে প্রাণিসম্পদ খাতের অবদানও আরও বাড়বে।

বাড়ছে দুধ, মাংস ও ডিম উৎপাদন

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে এ সময়ে দুধ উৎপাদিত হয়েছে ১৫৭ দশমিক ৫৩ লাখ টন। আগের অর্থবছরে উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ১৫৫ দশমিক ৩৮ লাখ টন। এক বছরে দুধ উৎপাদন বেড়েছে ২ দশমিক ১৫ লাখ টন।

দুধ উৎপাদন বাড়াতে গবাদিপশুর জাত উন্নয়ন, উন্নত পশুখাদ্য সরবরাহ, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও খামার ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়নে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে প্রায় ৪ হাজার ২৮০ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, বাজারসংযোগ, প্রাণী বীমা ও দুধের ভোক্তা তৈরিতে কাজ করা হয়েছে। স্কুল ফিডিং কার্যক্রমের মাধ্যমেও শিশুদের মধ্যে দুধ পানের অভ্যাস গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মাংস উৎপাদনেও প্রবৃদ্ধি রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে মাংস উৎপাদিত হয়েছিল ৮৯ দশমিক ৫৪ লাখ টন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে ৯০ দশমিক ৭০ লাখ টন। একই সময়ে দেশে গরুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৫৩ দশমিক ২৯ লাখ এবং ছাগলের সংখ্যা ২৭৪ দশমিক ৬৫ লাখে। পোল্ট্রি খাতেও উৎপাদন বেড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে ডিম উৎপাদিত হয়েছে ২ হাজার ৫০৯ কোটি ৪১ লাখ। আগের অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছিল ২ হাজার ৪৪০ কোটি ৬৫ লাখ। অর্থাৎ এক বছরে ডিম উৎপাদন বেড়েছে ৬৮ কোটি ৭৬ লাখ।

অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট পরিবারের ৪৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে প্রাণিসম্পদ ও পোল্ট্রি পালনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এর মধ্যে ১১ দশমিক ১৫ শতাংশ পরিবার শুধু প্রাণিসম্পদ পালন এবং ২৩ দশমিক ৫২ শতাংশ পরিবার শুধু পোল্ট্রি পালনের সঙ্গে যুক্ত।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান ১ দশমিক ৮১ শতাংশ। মোট কৃষিজ জিডিপিতে এ খাতের অংশ ১৬ দশমিক ৫৬ শতাংশ। এ সময়ে খাতটির জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৩ দশমিক ৩০ শতাংশ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. দীন ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের উৎপাদকদের অনেক সময় বাজার গবেষণা ও বিপণনের ঘাটতি থাকে। পণ্য থাকলেও কোন বাজারে কী চাহিদা রয়েছে, তা বুঝতে হবে। ব্র্যান্ডিং ও প্যাকেজিং উন্নত করতে হবে। বাণিজ্য ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ও দরকার।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. শাহজামান খান বলেন, বিশ্বে এখন হালাল অর্থনীতির ধারা চলছে। বাংলাদেশও সেই ধারা অনুসরণের চেষ্টা করছে। এ লক্ষ্যে প্রাণিসম্পদ খাতে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা এবং প্রাণিজ খাদ্যপণ্য উৎপাদনের জন্য বিভিন্ন ফিডমিলে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত ২০০টি ফিডমিল বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে নোটিশও দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, রপ্তানি আয় বাড়াতে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের গুণগত মান, খাদ্যনিরাপত্তা, রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি মানদণ্ড অনুসরণের কাজ চলছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পরীক্ষাগার, আধুনিক সংরক্ষণব্যবস্থা, প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা ও মানসম্মত প্যাকেজিং সুবিধা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, উন্নত খাদ্য ব্যবস্থাপনা, সবুজ ঘাস উৎপাদন বৃদ্ধি, বায়োগ্যাস প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কার্বন ব্যালেন্সিং পদ্ধতি প্রয়োগের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব প্রাণিসম্পদ খাত গড়ে তুলতে সরকার কাজ করছে। এর সুফল মিলছে। আমরা যদি ভাল মানের পণ্য উৎপাদন করতে পারি, তাহলে দেশের চাহিদা মিটিয়ে ডিম, দুধ ও মাংস রপ্তানি আরও বাড়াতে পারবো।

Logo