পোলট্রি ফিডের কাঁচামালের দাম ২৭% পর্যন্ত বেড়েছে, পশুখাদ্য উৎপাদনকারীরা লোকসানে
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০:১৫
আগস্টের শুরুতে প্রতি কেজি পশুখাদ্যের দাম ছিল প্রায় ৬৮ টাকা, যা এখন বেড়ে সর্বোচ্চ ৭২ টাকা ৫০ পয়সায় উঠেছে। অর্থাৎ, এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে দাম বেড়েছে প্রায় ৭ শতাংশ। তবে পশুখাদ্য উৎপাদনকারীরা বলছেন, কাঁচামালের দাম বাড়লেও সে অনুপাতে প্রস্তুত খাদ্যের দাম বাড়ানো যায়নি। ফলে এখনও প্রতি কেজিতে ৩ টাকার বেশি লোকসান গুনতে হচ্ছে তাদের।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রধান কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় এক মাসের মধ্যে দুই দফায় পশুখাদ্যের দাম বাড়ানো হয়েছে। এতে একদিকে ফিড মিলগুলোকে লোকসান বহন করতে হচ্ছে, অন্যদিকে খামারিরা উৎপাদন কমাতে বাধ্য হচ্ছেন এবং ভোক্তাদের ডিম ও মুরগির জন্য বেশি দাম গুনতে হচ্ছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, গত এক মাসে ভুট্টার দাম প্রায় ২৪ শতাংশ, ডি-অয়েলড রাইস ব্র্যানের (ডিওআরবি) দাম ২৭ শতাংশ এবং সয়াবিন মিলের দাম ২০ শতাংশ বেড়েছে। বেড়েছে অন্যান্য প্রোটিন উৎসের দামও। পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের ওঠানামায় আমদানি করা কাঁচামালের ওপর ব্যয়ের চাপ আরও বেড়েছে।
ফিডের দাম বাড়ার পাশাপাশি গত কয়েক মাসে ওষুধ, টিকাসহ অন্যান্য উৎপাদন উপকরণের দামও বেড়েছে। এতে লোকসান গুনতে গুনতে অনেক খামারি উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছেন, কেউ কেউ ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছেন।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্য ও সাম্প্রতিক বাজার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ফিড তৈরির প্রধান উপাদানগুলোর প্রায় সব কটির দাম এক মাসের ব্যবধানে বেড়েছে। ১৩ শতাংশ আর্দ্রতার ভুট্টার দাম বর্তমানে কেজিপ্রতি ৩৮ টাকা ৮০ পয়সা। এক মাস আগে ছিল ৩১ টাকা ৩০ পয়সা। ডিওআরবির (ডি-অয়েলড রাইস ব্র্যান) দাম ২৬ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৩৩ টাকা। ১৬ শতাংশ তেলযুক্ত চালের কুঁড়ার দাম ৩৩ টাকা থেকে বেড়ে ৩৯ টাকা হয়েছে। সরিষার খৈলের দাম ৩৬ টাকা ৫০ পয়সা থেকে বেড়ে হয়েছে ৩৯ টাকা ৭০ পয়সা। আর সয়াবিন মিলের দাম ৫৮ টাকা থেকে বেড়ে ৬৬ টাকা হয়েছে।
ফিড উৎপাদনে ব্যবহৃত অন্যান্য প্রোটিন উৎসের দামও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে। এর সঙ্গে মুদ্রাবাজারে, বিশেষ করে ডলারের বিনিময় হারের ওঠা-নামার কারণেও আমদানিনির্ভর পণ্যের দামে পরিবর্তন হচ্ছে। ভুট্টার বাজারে সাম্প্রতিক সময়ে বড় ধরনের চাপ দেখা দিয়েছে। খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের হিসাবে, মার্চ-এপ্রিল-মে মাসের মৌসুমে প্রতি কেজি ভুট্টা ২৮ থেকে ২৯ টাকায় পাওয়া গেলেও জুন, জুলাই ও আগস্টে তা বেড়ে ৩৮ থেকে ৪০ টাকায় উঠেছে। আন্তর্জাতিক বাজারেও ভুট্টার দাম প্রতি টন ২৩৫-২৪০ ডলার থেকে বেড়ে প্রায় ২৯০ ডলারে পৌঁছেছে। ফিডের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল ভুট্টার এই মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়ছে ফিডের দামে। আর ফিডের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে পোলট্রি, মাছ ও গবাদিপশু উৎপাদনের খরচও।
আন্তর্জাতিক বাজারেও সাম্প্রতিক সময়ে এসব পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতা রয়েছে। বৈশ্বিক বাণিজ্য ও পণ্যবাজারবিষয়ক তথ্য সরবরাহকারী ট্রেডিং ইকোনমিকসের হিসাবে, আগস্টের তুলনায় সেপ্টেম্বরের এ পর্যন্ত বিশ্ববাজারে সয়াবিন মিল বা খৈলের গড় দাম বেড়েছে ৮ দশমিক ৪৩ শতাংশ। একই সময়ে গমের দাম বেড়েছে ৪ দশমিক ৮৯ শতাংশ এবং ভুট্টার ১৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ।
পোলট্রি ও গবাদিপশুর ফিডের দাম বাড়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, একটি মানসম্মত ফিড তৈরির মোট খরচের প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ কাঁচামাল কেনায় ব্যয় হয়। ভুট্টা, সয়াবিন মিল, রাইস ব্র্যান ও ডিওআরবির মতো মৌলিক উপাদানের দাম স্থানীয় বা আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়লে ফিড মিলগুলোর পক্ষে আগের দামে ফিড বিক্রি করা কঠিন হয়ে পড়ে। একইভাবে কাঁচামালের বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হলেও ফিডের দাম বেড়ে যায়।
বগুড়া সদরের পোলট্রি খামারি হাফিজুর রহমান বলেন, গত এক সপ্তাহে বিভিন্ন ধরনের প্রাণিজ খাবারের দাম কেজিতে দুই থেকে তিন টাকা বেড়েছে। ৫০ কেজির এক বস্তা ফিডের দাম বেড়েছে সর্বোচ্চ ১৫০ টাকা। তবে ব্র্যান ও ভুট্টার দাম বেড়েছে সবচেয়ে বেশি। ৫০ কেজির এক বস্তা ব্র্যানের দাম ১ হাজার ৩০০ টাকা থেকে বেড়ে ১ হাজার ৮০০ টাকা হয়েছে। ভুট্টার দাম কেজিতে ২৫ টাকা থেকে বেড়ে ৩৭ টাকা হয়েছে। ৫০ কেজির এক বস্তা পোলট্রি ফিডের দাম বেড়ে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৬৭৫ টাকা পর্যন্ত উঠেছে।
গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলা সদরের প্রাণিজ খাদ্য বিক্রেতা সলিম উল্যাহ বলেন, ভুট্টার দাম বাড়ায় সব ধরনের ফিডের দাম বেড়েছে। ফলে বেশি দামে ফিড কিনে বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। দাম বাড়ায় ক্রেতাও কমে গেছে।
বাংলাদেশ প্রান্তিক পোলট্রি খামারি পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাসেল প্রধান বলেন, দেশের ফিডের কাঁচামালের সংকট ও মূল্যবৃদ্ধি মোকাবিলায় স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ডিওআরবি ও রাইস ব্র্যানের সরবরাহ আগে দেশের চাহিদা অনুযায়ী নিশ্চিত করা দরকার। প্রয়োজনে এসব পণ্যের রপ্তানিতে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা বা কঠোর নিয়ন্ত্রণ দেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি আমদানি করা কাঁচামালের ওপর ভ্যাট, কর ও শুল্ক কমানো এবং বাজারে কৃত্রিম সংকট ঠেকাতে নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানিমেল নিউট্রিশন বিভাগের প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. শফিকুর রহমান শিশির বলেন, ডিওআরবি ও রাইস ব্র্যানের মতো স্থানীয় কাঁচামালের ক্ষেত্রে আগে অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ করা উচিত। তবে রপ্তানির সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ না করে উৎপাদক ও স্থানীয় শিল্পের স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম বাড়লে আমদানি পর্যায়ের কর ও শুল্ক সাময়িকভাবে সমন্বয় করা যেতে পারে।
এ বিষয়ে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশীদ বলেন, ‘বৈশ্বিক ও দেশের বাজারে ফিডের কাঁচামালের দাম বেড়েছে। এতে উৎপাদকদের উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। আবার ফিডের দাম বাড়ায় কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে। তারা এজন্য চাপে আছেন। দ্রুত ফিড ইন্ডাস্ট্রির প্রতিনিধি এবং খামারি প্রতিনিধিদের সঙ্গে বসব। একটা সমাধান বের করার চেষ্টা করব। সরকার প্রান্তিক খামারিদের সুরক্ষায় অবশ্যই ব্যবস্থা নেবে।’
