বিশ্ব হাতি দিবস: বন হারালে হারাবে হাতির নিরাপদ আশ্রয়
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬, ১১:৪৮
ছবি: সংগৃহীত
বন কমছে, সংকুচিত হচ্ছে বন্য প্রাণীর আবাসস্থল। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে হাতির ওপরও। খাবার, পানি ও নিরাপদ চলাচলের জন্য বড় এলাকাজুড়ে বিচরণ করা এই প্রাণী যখন বন হারায়, তখন মানুষের বসতিতে ঢুকে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে। আর সেখান থেকেই তৈরি হয় মানুষ ও হাতির সংঘাত।
এই বাস্তবতা সামনে রেখে প্রতিবছর ১২ আগস্ট পালিত হয় বিশ্ব হাতি দিবস। দিনটির উদ্দেশ্য শুধু হাতির প্রতি মানুষের ভালোবাসা তৈরি করা নয়; বরং তাদের আবাসস্থল রক্ষা, অবৈধ শিকার বন্ধ এবং মানুষ ও হাতির সহাবস্থান নিশ্চিত করার বিষয়ে বিশ্বজুড়ে সচেতনতা বাড়ানো।
২০১২ সালে প্রথম বিশ্ব হাতি দিবস পালিত হয়। কানাডীয় চলচ্চিত্র নির্মাতা প্যাট্রিসিয়া সিমস এবং থাইল্যান্ডের এলিফ্যান্ট রি-ইন্ট্রোডাকশন ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে দিবসটি আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিতি পায়। একই বছর সিমসের নির্মিত ‘রিটার্ন টু দ্য ফরেস্ট’ চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায়, যেখানে বন্দিদশা থেকে এশীয় হাতিকে বনে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা তুলে ধরা হয়।
সময়ের সঙ্গে হাতি সংরক্ষণের চ্যালেঞ্জ আরও জটিল হয়েছে। বন উজাড়, কৃষিজমির সম্প্রসারণ, সড়ক ও বসতি নির্মাণ, অবৈধ শিকার এবং হাতির চলাচলের পুরোনো পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া তাদের অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। আবাসস্থল খণ্ডিত হওয়ার ফলে হাতিরা খাবার ও পানির সন্ধানে মানুষের বসতিতে ঢুকে পড়ে এবং সংঘাতের ঘটনা বাড়ে।
বাংলাদেশেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। দেশের বন্য হাতির প্রধান আবাসস্থলগুলোর মধ্যে চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বনাঞ্চল অন্যতম। কিন্তু এসব এলাকায় মানুষের বসতি ও বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের চাপ হাতির চলাচলের পথ সংকুচিত করছে। গবেষণাতেও কক্সবাজারের টেকনাফ অঞ্চলে মানুষের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে হাতির আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ার সম্পর্ক উঠে এসেছে।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোও সংকটের গভীরতা স্পষ্ট করছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে কক্সবাজারের রামুতে বন্য হাতির আক্রমণে এক মা ও তাঁর তিন বছরের শিশুকন্যা নিহত হন। এর আগে-পরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় হাতি মারা যাওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছে। মে মাসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ২০১৭ সাল থেকে মানুষ ও হাতির সংঘাতে বাংলাদেশে অন্তত ১৫১টি হাতি মারা যাওয়ার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
কক্সবাজারের টেকনাফে জুলাই মাসে আরেকটি ঘটনা হাতিদের জন্য প্রাকৃতিক পরিবেশের ঝুঁকিও সামনে আনে। ভারী বৃষ্টির পর পাহাড়ের একটি অংশ ধসে পড়লে খাবারের সন্ধানে চলাচল করা একটি বন্য হাতি প্রায় ৩০০ ফুট নিচে পড়ে গুরুতর আহত হয়। বন বিভাগের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে হাতিটিকে উদ্ধার ও চিকিৎসার উদ্যোগ নেন।
হাতি রক্ষা তাই শুধু একটি প্রাণীকে বাঁচানোর বিষয় নয়। হাতির বিচরণক্ষেত্র, বন ও প্রাকৃতিক করিডোর রক্ষা করা মানে একই সঙ্গে একটি পুরো বাস্তুতন্ত্রকে রক্ষা করা। মানুষের বসতি ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলের মধ্যে পরিকল্পিত দূরত্ব বজায় রাখা, হাতির চলাচলের করিডোর সংরক্ষণ, বন পুনরুদ্ধার এবং সংঘাতপ্রবণ এলাকায় দ্রুত সতর্কতা ও উদ্ধারব্যবস্থা জোরদার করা এখন জরুরি।
বিশ্ব হাতি দিবসে তাই বার্তাটি হওয়া উচিত স্পষ্ট—হাতিকে শুধু বন থেকে দূরে রাখতে নয়, বরং হাতির জন্য বন ও নিরাপদ পথটুকুও বাঁচিয়ে রাখতে হবে। কারণ নিরাপদ বন ছাড়া নিরাপদ হাতি সম্ভব নয়; আর হাতির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে রক্ষা পাবে প্রকৃতির ভারসাম্যও।
