Logo
×

Follow Us

প্রাণিসম্পদ

৪০ হাজার টাকার ঋণ থেকে যেভাবে গৃহবধূ শাহীন আক্তারের ১৫ লাখ টাকার খামার

Icon

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬, ২২:৩১

৪০ হাজার টাকার ঋণ থেকে যেভাবে গৃহবধূ শাহীন আক্তারের ১৫ লাখ টাকার খামার

চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার শাহীন আক্তারের জীবনের গল্প যেন সংগ্রাম থেকে সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। একসময় অভাব-অনটনের সংসারে দুই বেলা খাবার জোগাড় করতেই হিমশিম খেতে হতো তাঁকে। সেই শাহীন এখন ১৪টি গরুর মালিক। গড়ে তুলেছেন মাঝারি আকারের একটি খামার। গরু পালন করে শুধু সংসারের অভাব দূর করেননি, নির্মাণ করেছেন পাকা বাড়ি, উচ্চশিক্ষা দিয়েছেন সন্তানদেরও।

শাহীন আক্তারের বাড়ি চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার আধুনগর ইউনিয়নের আকবরপাড়া এলাকায়। প্রায় ২৫ বছর আগে দরিদ্র এক কৃষক পরিবারে তাঁর বিয়ে হয়। স্বামী আবু সুফিয়ান ছিলেন বর্গাচাষি। সংসারে ছিল নিত্য অভাব। এর মধ্যে জন্ম নেয় তিন কন্যাসন্তান। উন্নত জীবনের আশায় ধারদেনা করে স্বামীকে সৌদি আরবে পাঠান শাহীন। কিন্তু সেখানে নিয়মিত কাজ না পাওয়ায় পাঁচ বছর পর ২০০৯ সালে দেশে ফিরে আসেন সুফিয়ান। এরপর দেনার চাপ ও সংসারের ব্যয় মেটাতে দিশেহারা হয়ে পড়েন তাঁরা।

এই অবস্থায় ২০১০ সালে একটি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ৪০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে দুটি বাছুর কেনেন শাহীন আক্তার। উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের পরামর্শে শুরু হয় তাঁর খামারি জীবন। প্রথম দুটি বাছুর পালন করে লাভের মুখ দেখেন। এরপর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে স্বল্পসুদে ঋণ নিয়ে ধীরে ধীরে খামারের পরিধি বাড়াতে থাকেন।

গত রোববার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পাকা বাড়ির সামনেই রয়েছে তাঁর গরুর খামার। সেখানে ১৪টি শাহিওয়াল জাতের গরু কোরবানির ঈদ উপলক্ষে বিক্রির জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। গরুর পাশাপাশি ৩০টি কবুতর, ২৫টি দেশি মুরগি, ২০টি হাঁস ও চারটি ছাগলও পালন করছেন তিনি।

শাহীন আক্তার বলেন, স্বামীকে বিদেশে পাঠিয়েও যখন ভাগ্য ফেরেনি, তখন গরু পালনের সিদ্ধান্ত নিই। প্রথমে দুটি বাছুর কিনেছিলাম। সেগুলো বিক্রি করে লাভ হওয়ার পর উৎসাহ পাই। এরপর ধীরে ধীরে খামার বড় করেছি। এখন গরু পালনই আমাদের প্রধান আয়ের উৎস।

তিনি জানান, বর্তমানে তাঁর খামারের ১৪টি গরুর মূল্য প্রায় ১৫ লাখ টাকা। সম্প্রতি কোরবানির হাটে আড়াই লাখ টাকায় দুটি গরু বিক্রি করেছেন। গরু পালন থেকে পাওয়া লাভের অর্থ দিয়ে সব দেনা শোধ করেছেন এবং ২০১৯ সালে নির্মাণ করেছেন একতলা পাকা বাড়ি।

চার সন্তানের মধ্যে বড় মেয়ে রেশমা আক্তার স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে বিবাহিত জীবন শুরু করেছেন। মেজো মেয়ে সুমাইয়া আক্তার ডিপ্লোমা শেষ করে বর্তমানে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নার্স হিসেবে কর্মরত। ছোট মেয়ে জাকিয়া সোলতানা চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে অধ্যয়ন করছেন। একমাত্র ছেলে আলিফ তাহাসিন স্থানীয় একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।

খামারে কোনো শ্রমিক নেই। শাহীন নিজেই গরুর পরিচর্যা করেন। তাঁকে সহযোগিতা করেন তাঁর স্বামী। গরুর খাদ্যের জোগান দিতে দুই একর জমি বর্গা নিয়ে সেখানে ভুট্টা ও নেপিয়ার ঘাস চাষ করছেন তাঁরা। উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় থেকে একটি ঘাস কাটার যন্ত্র ও একটি ভুট্টা মাড়াইয়ের যন্ত্রও পেয়েছেন প্রণোদনা হিসেবে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিষয়ে শাহীন আক্তার বলেন, আমার সাফল্য দেখে এলাকার অনেক নারী এখন গরু পালন শুরু করেছেন। সামনে খামারের পরিধি আরও বাড়াতে চাই। পাশাপাশি একটি দুগ্ধ খামার গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

লোহাগাড়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা সেতু ভূষণ দাশ বলেন, শাহীন আক্তার একজন অদম্য নারী। তাঁর সাফল্য অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণা। আমরা নিয়মিত প্রশিক্ষণ, ভ্যাকসিন ও কারিগরি সহায়তা দিয়ে থাকি। সঠিক পরিকল্পনা ও পরিশ্রম থাকলে যে কেউ গরু পালন করে সফল হতে পারেন। সংগ্রাম, অধ্যবসায় ও সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে শাহীন আক্তার প্রমাণ করেছেন, ক্ষুদ্র উদ্যোগও একসময় বড় সাফল্যের ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।

Logo