বন্যায় বিপর্যস্ত কক্সবাজার: কৃষিতে বড় ক্ষতি, প্রাণহানি ৩০
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬, ১০:১৭
ছবি- সংগ্রহ
টানা দুর্যোগের একাদশ দিনে এসে কক্সবাজারে বৃষ্টিপাতের তীব্রতা
অনেকটাই কমেছে। প্লাবিত অঞ্চলগুলো থেকে ধীরে ধীরে পানি সরে যেতে শুরু করায় দীর্ঘ
নয় দিনের বন্যা ও পাহাড়ধসের ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির বাস্তব চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সরকারি
সংস্থাগুলো ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক হিসাব তৈরির কাজ শুরু করেছে।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ জুলাই থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত
মাত্র নয় দিনে জেলায় মোট ৮২৩
মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। অতিবৃষ্টির ফলে জেলার ৭১টি ইউনিয়নের মধ্যে ৭০টি এবং ৫টি পৌরসভার মধ্যে ৪টি বিভিন্ন
মাত্রায় জলাবদ্ধতা ও বন্যার কবলে পড়ে। এতে প্রায় আড়াই লাখ মানুষ পানিবন্দী অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন
করতে বাধ্য হন।
ভারী বর্ষণ, পাহাড়ধস ও আকস্মিক বন্যায় এ পর্যন্ত ১৩ জন রোহিঙ্গাসহ মোট ৩০ জনের মৃত্যু
হয়েছে। এছাড়া এখনও একজন নিখোঁজ
রয়েছেন। প্রাথমিক মূল্যায়নে দেখা গেছে, দুর্যোগে ১ হাজার ৬১৩টি বসতবাড়ি এবং ৩০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে ২
হাজার ৪৮ কিলোমিটার সড়ক এবং ৭৯টি সেতু ও কালভার্ট বিভিন্নভাবে ক্ষতির মুখে
পড়েছে।
উপজেলাভিত্তিক ক্ষয়ক্ষতির মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছে চকরিয়া ও পেকুয়া। চকরিয়া উপজেলার প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা পানিতে ডুবে
যায়। সেখানে ৬ জনের মৃত্যু
এবং একজন নিখোঁজ
হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। উপজেলায় প্রায় ৩৫০
কিলোমিটার সড়ক ও ২০টি
কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে পেকুয়ার ৯৫ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়ে দুইজনের প্রাণহানি ঘটে। এ
উপজেলায় ৪৫০টি ঘরবাড়ি
ও ২৩০ কিলোমিটার সড়ক
ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
উখিয়ায় পাহাড়ধস সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ নেয়। সেখানে ১৩ জন রোহিঙ্গাসহ মোট ১৪ জনের মৃত্যু
হয়েছে। এছাড়া কক্সবাজার সদর উপজেলায় তিনজন,
রামুতে দুইজন এবং
মাতামুহুরী, মহেশখালী, কুতুবদিয়া ও টেকনাফে একজন করে প্রাণ হারিয়েছেন। অবকাঠামোগত ক্ষতির দিক
থেকে মহেশখালীতে সবচেয়ে বেশি ১
হাজার ২০০ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কুতুবদিয়া ও পেকুয়ায় ১৫টি করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। তুলনামূলকভাবে ঈদগাঁও উপজেলার মাত্র ৫ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হলেও
সেখানে ৩০টি বাড়ি
এবং ৫ কিলোমিটার সড়ক
ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, বাঁকখালী ও মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার
ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় জেলার ৪৪টি
স্থানে বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে চকরিয়ার কোনাখালী
ইউনিয়নের পুরুত্যাখালী পূর্বপাড়া এলাকায় প্রায় ২৫ মিটার বেড়িবাঁধ সম্পূর্ণ ভেঙে গেছে।
কৃষি খাতেও দুর্যোগের প্রভাব ছিল ব্যাপক। কৃষি সম্প্রসারণ
অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৪
হাজার ২১২ হেক্টর জমির বিভিন্ন ফসল নষ্ট হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ফসলের
মধ্যে রয়েছে ২ হাজার ৬২০ হেক্টর
আউশ ধান, ৪৭০
হেক্টর আমনের বীজতলা, ৯৯৫
হেক্টর শাক-সবজি এবং ১৬৬
হেক্টর পানের বরজ। এতে সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়েছেন ৪৩ হাজার ২১০ জন কৃষক।
জেলা প্রশাসক মো.
আ. মান্নান জানান, বর্তমানে জেলার ৬১৮টি আশ্রয়কেন্দ্রে ১ হাজার ৫৮০ জন মানুষ অবস্থান
করছেন। দুর্গতদের জন্য ইতোমধ্যে ৭
হাজার ৭৯০ প্যাকেট শুকনো খাবার এবং ২৯৮ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা
হয়েছে। পাশাপাশি অতিরিক্ত ত্রাণ সহায়তার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে নতুন করে
চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে।
প্রশাসনের
মতে, পানি দ্রুত নেমে গেলেও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন, ভাঙা অবকাঠামো
মেরামত এবং কৃষি উৎপাদন পুনরুদ্ধারে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ প্রয়োজন হবে।
