Logo
×

Follow Us

কৃষি

তেলের অভাবে কৃষকের হাহাকার, কর্মকর্তাদের প্রতিদিন হাজার লিটার অপচয়

Icon

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২০ এপ্রিল ২০২৬, ০০:১৮

তেলের অভাবে কৃষকের হাহাকার, কর্মকর্তাদের প্রতিদিন হাজার লিটার অপচয়

জ্বালানি সাশ্রয়ের কড়াকড়ি নির্দেশনার মধ্যেই সরকারি প্রতিষ্ঠানে অপচয়ের চিত্র সামনে এসেছে। বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার যখন ব্যয় কমানোর ওপর জোর দিচ্ছে, তখন রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সংস্থা বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনে (বিএডিসি) উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। সরকারি গাড়ির যথেচ্ছ ব্যবহারের কারণে প্রতিদিনই অপচয় হচ্ছে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন ১৮টি দপ্তরের মধ্যে বৃহৎ রাষ্ট্রীয় সংস্থা হিসেবে বিএডিসি অন্যতম। রাজধানীজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে সংস্থাটির ৫০ থেকে ৬০টি দপ্তর। মতিঝিলের দিলকুশায় কৃষি ভবন ছাড়াও মানিক মিয়া অ্যাভিনিউর সেচ ভবন, গ্রিন রোডের দপ্তর, গাবতলীর বীজ পরীক্ষাগার ও উৎপাদন কেন্দ্রসহ বিভিন্ন স্থানে কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এসব দপ্তরের কর্মকর্তাদের জন্য বরাদ্দ রয়েছে প্রায় ১০০টি সরকারি গাড়ি।

সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী, অফিস শেষে গাড়ি নির্ধারিত গ্যারেজ বা পরিবহন পুলে রাখার কথা। কিন্তু অধিকাংশ গাড়িই সংশ্লিষ্ট দপ্তরে না রেখে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে মিরপুর-১ নম্বর স্টাফ কোয়ার্টারে। সেখানে চালক ও কিছু কর্মচারী থাকেন। কিন্তু যেসব কর্মকর্তার জন্য গাড়ি বরাদ্দ, তারা কেউই ওই কোয়ার্টারে বসবাস করেন না। ফলে প্রতিদিনই অপ্রয়োজনে গাড়ি ব্যবহার হচ্ছে। যেমন– কোনো কর্মকর্তার কর্মস্থল দিলকুশা, বাসা মহাখালী বা ধানমন্ডিতে। তাঁকে অফিসে নামিয়ে দিয়ে চালক গাড়ি নিয়ে যাচ্ছেন মিরপুরে। পরদিন আবার সেখান থেকে গাড়ি নিয়ে যাচ্ছেন ওই কর্মকর্তার বাসায়। তারপর অফিস শেষে ওই কর্মকর্তা যান বাসায়, গাড়ি যায় স্টাফ কোয়ার্টারে। এই অতিরিক্ত যাতায়াতের পুরো অংশই প্রশাসনিকভাবে অপ্রয়োজনীয়, কিন্তু জ্বালানি খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে কয়েকগুণ।

মিরপুর স্টাফ কোয়ার্টারে গিয়ে দেখা যায়, সীমিত সংখ্যক গ্যারেজ থাকায় বেশির ভাগ গাড়িই খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকে। এতে যেমন গাড়ির নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ছে, তেমনি রোদ-বৃষ্টিতে দ্রুত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও বাড়ছে।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, প্রতিটি গাড়িতে প্রতিদিন গড়ে ৮ থেকে ১০ লিটার পর্যন্ত জ্বালানি শুধু এই অতিরিক্ত যাতায়াতে খরচ হচ্ছে। সে হিসাবে ১০০টি গাড়ির ক্ষেত্রে দৈনিক অপচয় দাঁড়াচ্ছে ৮০০ থেকে এক হাজার লিটার। মাসে তা গিয়ে দাঁড়ায় প্রায় ২২ থেকে ২৫ হাজার লিটারে। বর্তমান বাজারদরে এই জ্বালানির মূল্য ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা। বছরে এই অপচয়ের পরিমাণ কয়েক কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এই পুরো অর্থই শেষ পর্যন্ত বহন করছে সরকারি কোষাগার।

শুধু অতিরিক্ত যাতায়াত নয়, সরকারি গাড়ি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। একাধিক সূত্র বলছে, কিছু চালক নিয়ম ভেঙে এসব গাড়ি ব্যবহার করছেন পরিবারের সদস্যদের আনা-নেওয়া, ব্যক্তিগত অনুষ্ঠান বা ছুটির দিনের ভ্রমণে। কোথাও কোথাও ভাড়ায় গাড়ি চালানোর অভিযোগও উঠেছে। এতে একদিকে যেমন জ্বালানি অপচয় বাড়ছে, অন্যদিকে গাড়ির ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে দ্রুত ক্ষয় হচ্ছে যন্ত্রাংশ। ফলে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও বাড়ছে।

সরকারি গাড়ি ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রতিদিনের যাতায়াত, কিলোমিটার ও জ্বালানি খরচ লগবুকে লিপিবদ্ধ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে এই লগবুক ঠিকভাবে সংরক্ষণ করা হয় না। বাস্তব ব্যবহার ও কাগজের হিসাবের মধ্যে মিল পাওয়া যায় না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অফিসের কাজ না থাকলেও লগবুকে ডিউটি দেখিয়ে জ্বালানি খরচ দেখানোর অভিযোগ রয়েছে। আবার নির্ধারিত রুটের বাইরে গিয়ে ব্যক্তিগত কাজের জন্য গাড়ি ব্যবহারের ঘটনাও ঘটছে।

বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ও আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে সরকার জ্বালানি সাশ্রয়ে বিভিন্ন নির্দেশনা দিয়েছে। সরকারি খাতে জ্বালানি ব্যবহার কমাতে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত সাশ্রয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্টদের মতে, কিছু প্রতিষ্ঠানে এখনও সেই নির্দেশনার বাস্তব প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। বরং ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও নজরদারির ঘাটতির কারণে অপচয় অব্যাহত রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি গাড়ি ব্যবহারে শৃঙ্খলা ফেরাতে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি জরুরি। জিপিএস ট্র্যাকিং চালু করা হলে প্রতিটি গাড়ির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি নিয়মিত অডিটের মাধ্যমে জ্বালানি ব্যবহারের হিসাব যাচাই করতে হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএডিসির সাধারণ পরিচর্যা বিভাগের যুগ্ম পরিচালক আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে শনিবার বিকেলে টেলিফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

তবে বিএডিসির সচিব আবু জাফর রাশেদ বলেন, মিরপুর স্টাফ কোয়ার্টারই গাড়ি রাখার নির্ধারিত স্থান। মতিঝিলের কৃষি ভবনে পার্কিং থাকলেও পূর্ণাঙ্গ গ্যারেজ সুবিধা নেই। ফলে অনেক ক্ষেত্রে গাড়ি সেখানে রাখা সম্ভব হয় না। অফিস চলকালীন গাড়ি রাস্তায় রাখতে হয়। 

Logo