Logo
×

Follow Us

কৃষি

বিশ্বমঞ্চে সুন্দরবনের মধু

Icon

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৬ এপ্রিল ২০২৬, ২৩:৫৯

বিশ্বমঞ্চে সুন্দরবনের মধু

নেপালের এগ্রিকালচার অ্যান্ড ফরেস্ট্রি ইউনিভার্সিটিতে আজ সোমবার থেকে শুরু হচ্ছে আন্তর্জাতিক মৌ চাষ সম্মেলন। বিশ্বের প্রায় ২০টি দেশের গবেষক, কৃষিবিজ্ঞানী, মৌ চাষবিশেষজ্ঞ ও নীতিনির্ধারকরা একত্র হয়েছেন এই আয়োজনে। আগামী ১০ এপ্রিল পর্যন্ত চলা এই সম্মেলনে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে আধুনিক মৌ চাষ, কৃষি উৎপাদনে পরাগায়নের ভূমিকা, মানবস্বাস্থ্য ও গ্রামীণ জীবিকার উন্নয়ন।

এই আন্তর্জাতিক মঞ্চে এবারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো– বাংলাদেশের সুন্দরবনের মধুকে প্রথমবারের মতো বিশ্বপরিসরে তুলে ধরা। জিআই স্বীকৃতি পাওয়ার পর এটি দেশের জন্য নতুন এক সম্ভাবনার দরজা খুলে দিচ্ছে।

বাংলাদেশ থেকে ১২ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল অংশ নিচ্ছে সম্মেলনে। এই দলে যেমন আছেন গবেষক, তেমনি রয়েছেন মৌচাষি, মধু ব্যবসায়ী এবং একজন প্রান্তিক মৌয়াল। তারা দেশের মৌ খাতের বাস্তব চিত্র তুলে ধরবেন। যেখানে বিজ্ঞান, জীবিকা ও বাণিজ্য একে অপরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।

চট্টগ্রাম আলওয়ান মধু জাদুঘর ও গবেষণা কেন্দ্রের স্বত্বাধিকারী এবং স্বেচ্ছাসেবী মধুগবেষক সৈয়দ মোহাম্মদ মঈনুল আনোয়ার সম্মেলনে একটি পোস্টার উপস্থাপন করছেন। তাঁর উপস্থাপনায় উঠে আসছে সুন্দরবনের মধুর অনন্য বৈশিষ্ট্য, সংগ্রহের ঝুঁকি এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে এর গভীর সম্পর্ক। তিনি মনে করেন, আন্তর্জাতিক এই প্ল্যাটফর্মে অংশগ্রহণ শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, এটি বাংলাদেশের একটি ঐতিহ্য ও প্রাকৃতিক সম্পদকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরার সুযোগ।

সম্মেলনের বিভিন্ন কারিগরি অধিবেশনে মৌমাছির জীববিজ্ঞান, রোগব্যাধি, পরাগায়ন প্রক্রিয়া, মধুর গুণাগুণ এবং বাণিজ্যিক সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। বাংলাদেশ থেকে হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক আতিকুল ইসলাম তাঁর গবেষণাপত্র উপস্থাপন করছেন। এতে মধুর রাসায়নিক গঠন ও মান নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। এর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের উদ্যোক্তারা নিজেদের অভিজ্ঞতা ও সম্ভাবনার কথা তুলে ধরবেন।

এই সম্মেলনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের আরেকটি বিশেষ দিক হলো– প্রান্তিক পর্যায়ের একজন মৌয়ালের উপস্থিতি। সাতক্ষীরার মুক্তার হোসেন গাজীর জীবনের গল্প সুন্দরবনের বাস্তবতাকেই প্রতিফলিত করে। ছোটবেলা থেকেই তিনি বছরের নির্দিষ্ট সময় বনে গিয়ে মধু সংগ্রহ করতেন। সেই কাজ ছিল ঝুঁকিপূর্ণ, অনিশ্চিত। তবুও জীবিকার তাগিদে তিনি বারবার ফিরে গেছেন বনে। পানির নিচে বাঘের সঙ্গে লড়াই করে প্রাণে বেঁচে ফেরার অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনে বড় পরিবর্তন আনে। এরপর তাঁর ছেলেরা আর বনে যায় না। তারা এখন মৌ বাক্স নিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মধু সংগ্রহ করেন। তবু মুক্তার হোসেনের মনে রয়ে গেছে সুন্দরবনের প্রতি গভীর টান। তিনি বলেন, এই বনের মধুর স্বাদ ও গুণ অন্য কোথাও পাওয়া যায় না।

বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলে থাকা গবেষক, মৌচাষি ও ব্যবসায়ীরা এই সম্মেলনের মাধ্যমে একটি বড় সুযোগ দেখছেন। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রাকৃতিক মধুর চাহিদা বাড়ছে, একই সঙ্গে বাড়ছে মান নিয়ন্ত্রণ ও স্বচ্ছতার গুরুত্ব। এই প্রেক্ষাপটে সুন্দরবনের মধু একটি শক্তিশালী ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে পারে, যদি সঠিকভাবে এর বৈশিষ্ট্য, গুণাগুণ এবং সংগ্রহ পদ্ধতি তুলে ধরা যায়।

সম্মেলনে বাংলাদেশ থেকে আরও অংশ নিচ্ছেন রাজশাহীর আল মদিনা হানি এগ্রো এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. আকমুল হোসেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের তাহানি ফুডের স্বত্বাধিকার সাহাবুদ্দিন, চাঁদপুরের ইব্রাহিম খলিল, খুলনার অলিউল্লাহ আল মাহমুদ, নাটোরের মাহমুদুননবী, নারায়ণগঞ্জের মোহাম্মদ নাহিদ, চাঁপাইনবাবগঞ্জের আব্দুস সবুর, মৌচাষি মিজানুর রহমান ও তরুণ উদ্যোক্তা তানভীর আহমেদ।

উপকূল ও সুন্দরবন সংরক্ষণ আন্দোলনের সভাপতি মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, সুন্দরবন বাংলাদেশের প্রাকৃতিক মধুর সবচেয়ে বড় উৎস। আন্তর্জাতিক এই সম্মেলনে বাংলাদেশের গবেষকদের অংশগ্রহণ মধু গবেষণা, ভেজাল নিয়ন্ত্রণ এবং প্রাকৃতিক সম্পদনির্ভর জীবিকার বিষয়গুলোকে বৈশ্বিক অঙ্গনে তুলে ধরবে। এতে সুন্দরবনের মধুর আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিং আরও শক্তিশালী হবে।

Logo