দেশে কৃষি একসময় পুরোপুরি
স্থানীয় জাতের বীজ, প্রাকৃতিক খাদ্যভান্ডার ও জৈব পদার্থনির্ভর ছিল। এক
জমিতে বারবার ফসল ফলাতে হতো না। কয়েক মৌসুম ফেলে রাখলে প্রাকৃতিকভাবে উর্বর হয়ে
উঠত জমি। জৈব পদার্থের পচনক্রিয়ায় মাটি পুনরায় চাষযোগ্য হতো। আলাদা করে রাসায়নিক
সার দরকার পড়ত না। জনসংখ্যা বাড়ার কারণে খাদ্য চাহিদা পূরণ ও প্রযুক্তিগত উন্নতির
কারণে পরিস্থিতি বদলেছে। এসেছে উচ্চফলনশীল বীজ, যেগুলো প্রচুর
খাদ্য উপাদান চায়। মাটির মজুত ভান্ডার কুলিয়ে উঠতে না পারায় শুরু হয় রাসায়নিক
সারের ব্যবহার। ধীরে ধীরে প্রায় সব কৃষিজমিকে গ্রাস করেছে রাসায়নিক সার। ফলে
গুণগত মান হারাচ্ছে মাটি; উর্বরতা কমে যাওয়ায় কৃষককে আরও বেশি সার ব্যবহার করতে
হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে কৃষি মন্ত্রণালয় রাসায়নিক সারের ওপর শতভাগ
নির্ভরতা কমিয়ে কৃষিতে টেকসই পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে। নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, মাটির উর্বরতা রক্ষা ও পরিবেশ সুরক্ষায় জৈব সারের দিকে মনোযোগ
দিচ্ছে সরকার। জৈব সারের ব্যবহার বাড়াতে ইতোমধ্যে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, ধান আবাদে সারের ব্যবহার নিয়ে বিশ্বে শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে
বাংলাদেশ অন্যতম। ২০২০ সালের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি
হেক্টরে গড়ে ৩১৮ কেজি সার ব্যবহার করা হয়, যা বিঘায় প্রায়
৪৩ কেজি। চীনে হেক্টরপ্রতি সার ব্যবহার ৩৯৩ কেজি হলেও সেখানে জমিতে বছরে তিন ফসল
হয়। বাংলাদেশে হয় দুটি। উৎপাদন ও মৌসুমের সংখ্যা বিবেচনায় নিলে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি
সার ব্যবহার করছে বাংলাদেশ। কৃষি বিশেষজ্ঞরা একে মাত্রাতিরিক্ত বলে অভিহিত করেছেন।
কৃষি সচিব মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান বলেন, মানুষের শরীরের মতো জমিরও স্বাস্থ্য থাকতে হয়। অতিরিক্ত সার
ব্যবহারের কারণে কৃষিজমি তার উর্বরতা হারাচ্ছে। খরচ বাড়ছে, উৎপাদন কমছে। আমাদের এখন টেকসই কৃষির দিকে যেতে হবে।
তিনি বলেন, আমরা প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে রাসায়নিক সারের
অতি ব্যবহারের প্রবণতা কমাতে চাই। জৈব সারকে কৃষকের কাছে জনপ্রিয় করে ব্যবহার
বাড়াতে চাই।
সূত্র জানায়, ঢাকা মহানগরীর
বর্জ্য ব্যবহার করে জৈব সার তৈরির জন্য একটি প্লান্ট স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে
সরকার। এ ছাড়া গাজীপুর ও কক্সবাজার শহরের বর্জ্যকেও জৈব সারে রূপান্তরে একটি
প্রকল্প তৈরির কাজ চলছে। জৈব সার সম্প্রসারণের একটি প্রকল্পে অর্থায়ন করবে জলবায়ু
ট্রাস্ট ফান্ড। রাজধানীর পাশাপাশি কয়েকটি শহরকেও এ উদ্যোগের আওতায় আনা হবে।
পাশাপাশি গ্রামীণ পর্যায়ে কৃষকদের জৈব সার ও জৈব বালাইনাশক উৎপাদন এবং ব্যবহার
শেখাতে বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিভিন্ন ইউনিয়নকে ‘আদর্শ অর্গানিক ইউনিয়ন’ হিসেবে গড়ে তোলার
পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
গত ১২ বছরে কৃষি উপকরণে সরকারের ভর্তুকি দাঁড়িয়েছে বহুগুণ। কৃষি
মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, এসব সহায়তার ৮০ শতাংশের বেশি যাচ্ছে সারে। বর্তমান
বৈশ্বিক সংকটে সরকার সারের দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছে, যাতে ভর্তুকির চাপ কমে। কিন্তু এতে কৃষকের খরচ বেড়েছে।
বাংলাদেশ খাদ্য নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক-খানির সম্পাদক নুরুল আলম
মাসুদ বলেন, কৃষি বাজেটের ৭০ শতাংশ ভর্তুকি যদি সারের বাইরে জৈব
সার উৎপাদন ও টেকসই কৃষিতে ব্যয় করা যায়, তবে শুধু জমির
স্বাস্থ্যই ফিরবে না; সরকারের বিপুল অর্থ সাশ্রয় হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে রাসায়নিক সার ব্যবহার কমিয়ে জৈব সারনির্ভর কৃষির দিকে
যাওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। নিরাপদ খাদ্য, পরিবেশ সুরক্ষা
এবং কৃষিজমির দীর্ঘমেয়াদি উর্বরতা রক্ষার জন্য এটাই সময়োপযোগী পদক্ষেপ।
